Sunday, February 26, 2017

বসন্তের গল্পবৈঠক


রাজারহাটের ইকোট্যুরিজম পার্ক। চার নম্বর গেটের ডান দিকেই  "Leaves n Aroma"-র চা-ঠেক-এ মিতালী, সমীর এঁদের কবোষ্ণ আতিথেয়তায় রচিত কিংবা খচিত হল গল্পবৈঠকের এক বসন্ত বিকেল, গত বুধবার, ২২ ফেব্রুয়ারি,২০১৭। 
নানা রঙের বসন্ত।কালো।হলুদ।লাল।ধবধবে সাদা।এটা ছিল গল্পবৈঠকের ছোট-গল্পপাঠ অনুষ্ঠান।দশম অধিবেশন।শুরুতে জয়া চৌধুরীর স্তোত্রপাঠ,সারাক্ষণ রন্ধনে অপরিহার্য নুনের মতো ছড়ানো ছিটোনো রসিক মন্তব্য,টুকরো স্প্যানিশ গান ও মঙ্গলকাব্যের মনসাপালা এবং কথনে জয়ার সঞ্চালনাটি হয়ে উঠেছিল অপরূপ!প্রথমে চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের গল্প।মাতৃশক্তিকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ স্বেচ্ছায় আদর করে মর্যাদা দেবে না,তা মেয়েদেরই অর্জন করে নিতে হবে,এই-ই ছিল গল্পের বিষয়।তারপর নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের নিবেদন আমোদিনী পর্ব।কী হিমশীতলতা! ফুরোল গা- চমকানো অলৌকিকতায়!কিন্তু বহুক্ষণ কনকন করল এক মর্মান্তিক বাক্য: শহরকে আমোদিনী বুঝিতে পারে না...।যশোধরা রায়চৌধুরীর,অ্যাজ ইউজুয়াল,মধ্যবিত্ত দাম্পত্য বিবরণ,যা হাঙ্গরের দাঁতের মতো মসৃণভাবে রক্তপাত ঘটায়,টের পেতে সময় লাগে!ছেলের বউয়ের কাছ থেকে সংসার টেনে নিয়ে নিজের তাকে তুলে-রাখা এক শাশুড়ির গল্প,যাঁকে ঘৃণা করার জন্য নাক কুঁচকোতে গিয়েও সজল হয়ে এল মন! এরপর শ্রুতিনাটক।কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় ও সুস্মেলী দত্ত-র ছিমছাম পরিবেশনায় স্বরচিত নাটক 'প্রসঙ্গ নারী'।বৈদিক যুগের জিভ-কেটে-নেওয়া খনা আজও কত প্রাসঙ্গিক সেটাই তুলে ধরলেন ওঁরা।এবার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের মেটামরফোসিস।শুনতে শুনতে কাফকা পেরিয়ে মার্কোয়েজের যাদু বাস্তবতা মনে পড়ছিল। মঞ্জু তামাং সমাজের চাপে একটু একটু করে ডাইনি হয়ে ওঠে।ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ নেয় পুরুষ আগ্রাসনের!বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের 'গল্পপাঠ'। বরিষ্ঠ দীপ্তিদির আর ডাক পড়ে না সাহিত্যসভায়।তিনি ডেটেড! কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আপডেটেড কে,আর,কতটুকু!আপেক্ষিক তো সবই! শেষে ঝাঁকুনিটুকু চমৎকার।এবার শাশ্বতী সরকার।গল্পের নাম 'ছেঁড়া তার'।মেনোপজ-হয়ে-যাওয়া তন্বী নিত্য নতুনভাবে বসন্ত পেতে চায়। পারে না।কারণ,তার ছিঁড়ে গেছে কবে...! গার্গী রায়চৌধুরীর মেয়েলি উপন্যাস ১,স্বামীর মৃত্যুর পর,যে স্বামী ছাড়া আর জানত না কিছুই,সে কেমন নিজস্ব আইডেন্টিটি নিয়ে জেগে উঠল ধীরে ধীরে!পাপিয়া ভট্টাচার্যের গল্প আলোকলতা,তাঁর কণ্ঠবৈকল্যের কারণে আমাদের শুনতে না পাওয়ার অতৃপ্তি রয়ে গেল।সোনালি পড়লেন তাঁর মনস্তাত্বিক গল্প 'শব্দ'। শুধু মাথার মধ্যে শব্দ-ঘেরা-জগৎ,তার যন্ত্রণা,অস্বস্তি সবকিছু নিয়ে। 

নিজেদের কাজকর্ম ফেলে উইকডে তেও হাজির হয়েছিলেন যারা মানে তমালি রায়,পারমিতা মুন্সি,রীণা গিরি তাঁদের ওইদিন গল্পবৈঠকের প্রদোষে কবিতাপাঠ করতে আমন্ত্রণ জানানো হল ।স্মার্ট।প্রাসঙ্গিক স্ব কবিতা । আর হিডকোর চেয়ারপার্সন দেবাশিস সেন ভারী সুন্দর এক বক্তব্যে ধন্যবাদ জানালেন সবাইকে।আবার আসার আমন্ত্রণও দিলেন।হলুদ পাখির পালক হয়ে উড়ে বেড়াল বসন্তের এই গল্পবৈঠকের বিকেল পেরোনো সন্ধেবেলা। অনুষ্ঠান শেষ হল গল্প বৈঠকের জন্য রচিত নতুন থিম  সং গেয়ে। সমবেত এই গানটির রচয়িতা অয়ন চৌধুরী এবং সুরারোপ করেছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। 
প্রতিবেদনটি লিখছেন চৈতালী চট্টোপাধ্যায়
 


 ত্যি সত্যি বসন্ত এসে গেছিল। অন্যমাত্রায়, অন্যভাবে। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে বসন্তের মহিমা নতুন করে উপলব্ধ হল গতকালের এক গোধূলির গোলাপী বিকেলে। হ্যাঁ, রেড ডট। না, না আমিষ নয় কিছুই। সংখ্যাগরিষ্ঠ আমরাই। তাই লাল। গোলাপী নয় তবুও মেয়েলী এক বিকেল।রঙ্গীন বিকেল।  মায়াময় বিকেল। মাটির চায়ের পেয়ালার উষ্ণ অভ্যর্থণার বিকেল আর এই মহানগরের গল্পকারদের নিজস্ব এক বিকেল। আমরা কেমন করে যেন আসছি, দেখছি, পড়ছি আর জয় করছি মানুষের মন । আমরা কেমন এক ঘোরলাগা বন্ধুতায় জড়িয়ে যাচ্ছি ধীরে ধীরে।  আমাদের শিকড় এক। আমাদের ভাষা এক। আগের দিন ই ছিল ভাষা দিবস। তাই এ যেন আমাদের সকলের  প্রিয় মাতৃভাষার জন্য মরিয়া হয়ে কিছু করে দেখানও বটে । আমরা বাংলাভাষায় কত রকমের ভিন্নস্বাদের গল্প লিখছি আজকাল। আমাদের নিজেদের বাচনভঙ্গীমায় কত স্বকীয়তা। লেখায় মৌলিকতা, নিজস্বতা। লিখছি লিখছি আর লিখেই চলেছি আমরা। কিন্তু? কে দেবে এই লেখকের স্বীকৃতি? কে দেবে পুরষ্কার? কে নিত্যনতুন গল্প প্রকাশ করে আমাদের সৃষ্টিশীলতার বাহবা দেবে? তাই বলে আমরা কি থেমে থাকব? শৈবালদামের মত বদ্ধ ন‌ই তো আমরা । আমাদের এই পথচলাতেই আনন্দ। আমন্ত্রণ পেয়ে অভিভূত হয়েছিলাম আমরা, যেদিন ফেসবুক থেকে দেখে ইকোপার্কের মিতালী আমাদের তার চায়ের ব্যুটিক "লিভ্‌স এন্ড এরোম্যায়" গল্পবৈঠক এর আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন । আপ্লুত হয়েছিলাম তখন। কথায় বলে "যেচে মান আর কেঁদে সোহাগ"। কিন্তু আমাদের তো দুটোই পাওয়া হল। না চাইতেই, না ঘ্যান ঘ্যান কারতেই । সত্যি সত্যি শহরের বিভিন্ন প্রান্তে আমাদের গল্পবৈঠক যেভাবে সাড়া ফেলছে তাতে মনে হয় এই সাহিত্যসভাও আমাদের গল্প প্রকাশের একটি অতীব সুস্বাদু মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফাগুনের বসন্ত গতকালের বিকেলে নতুন করে ধরা দিয়ে গেল যেন। কেবল মনে হচ্ছিল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানের লাইনটি..."আমরা এমনি এসে ভেসে যাই, আলোর মতন, হাসির মতন, কুসুম গন্ধ রাশির মতন, হাওয়ার মতন, নেশার মতন, ঢেউয়ের মতন এসে যাই.."...হ্যাঁ, যাই ই তো। এ ভেসে যাওয়ায় এক অমলিন, অপার আনন্দ। এক অদ্ভুত মাদকতা। নতুন নতুন বন্ধুরা আসছে গল্প শুনতে, তাদের আসা ও ভালোলাগা কে কুর্ণিশ জানিয়ে তাদের কবিতা পাঠেরো সুযোগ দিতে ইচ্ছে হয় ঠিক তখনি। আর এবারের গল্পবৈঠকের দশম অধিবেশনে বিশাল প্রাপ্তি হিডকো'র চেয়ারম্যান শ্রী দেবাশীষ সেনের আমাদের গল্প শুনতে আসা এবং আতিথ্য গ্রহণ করে কিছু বক্তব্য রাখা। এমনো হয়? এ যেন গল্পবৈঠকের শুভ পথচলার আরেক শুভ ক্ষণ। অনুষ্ঠান শেষ হল আমাদের গল্পবৈঠকের সমবেত থিম সং পরিবেশন করে। যে গানের কথা আমাদের অয়ন চৌধুরীর আর সুরারোপ আমার। না থাকুক মুঠো মুঠো পলাশ। না থাক আবীর গুলাল। আমরা কিন্তু অনেক রং নিয়ে ঘরে ফিরেছি সকলে। 
প্রতিবেদনটি লিখেছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

3 comments:

  1. বইমেলা গল্প বৈঠকে গিয়ে দেখেছি কি আন্তরিক এর পরিবেশ । এবারে হলোনা বলে আক্ষেপ রয়ে গেলো । পরের বার যেন থাকতে পারি তার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি । গল্প গুলো পুরো শোনা হলোনা সে দুঃখ থেকেই যাবে ।

    ReplyDelete
  2. ্মনে থেকে যাবে সারা জীবন...। এতো ভাললাগা আর ভালবাসা।সব্বাই কে ভালবেসে বড্ড আনন্দ পেলাম।

    ReplyDelete