শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৭

গল্পবৈঠক একাদশ

শিলাদিত্য পত্রিকার  মে ইস্যু তে গল্প বৈঠক একাদশের কথা 





বার গল্পবৈঠকের একাদশ অধিবেশন হয়ে গেল গত ২৫শে মার্চ, কথাশিল্পী শরতচন্দ্রের স্মৃতিবিজড়িত অশ্বিনী দত্ত রোডের বাসভবনে। এবারের গল্পবৈঠকে প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেছিলেন নবনীতা দেব সেন। অণুগল্প পাঠ করলেন উদীয়মান দশ গল্পকার। ছোটগল্প পড়লেন দুজন। প্রতিটি গল্পের আলোচনায় ছিলেন প্রবীণ গল্পকার কণা বসু মিশ্র এবং এ প্রজন্মের গল্পকার তৃষ্ণা বসাক। গল্পপাঠ শেষে একটি আলোচনা চক্রে অংশ নিলেন চারজন। আলোচনার বিষয় ছিল "ফেসবুকে সাহিত্য"  সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন অয়ন চৌধুরী। 
শুরুতে শ্রদ্ধেয়া নবনীতা দেব সেনের সাবলীল আলাপচারিতায় উঠে এল কিছু জরুরী কথা। তাঁর স্নেহের উপদেশ  একটি ছত্রে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র ।
"আমার প্রথম বই বেরোয় ১৯৫৯ সালে। মানে ধরো ষাট বছর হল লেখা শুরু করেছি। আমরা যখন লিখতাম সবাই একা একাই লিখতাম। লেখা পত্রিকার ঠিকানায় পোষ্ট করতাম। আমরা যারা লেখালেখি করতাম চুপিচুপি, কখনও বা বন্ধুকে দেখাতাম। কোনোদিন পকেটে কবিতা নিয়ে বন্ধু চলে আসত। যারা লেখে তাদের সঙ্গে আলাপ হত। আমি কি লিখলাম তুই দ্যাখ, তুই কি লিখলি আমি দেখি। আমাদের একটা জগত ছিল খুব ব্যক্তিগত। আমরা পরস্পরকে ব্যক্তিগতভাবে সম্মান করতাম। বিশ্বাস করতাম। কোনও সমালোচনা সসম্মানে বিশ্বাস করে গ্রহণ করতাম। আমরা পরস্পরকে সত্য কথা বলতে পারতাম। কোনও অপমানবোধ ছিলনা। কাজেই মতামত দিতে দ্বিধা ছিলনা। লেখা নিয়ে এ ওর বাড়ি চলে যেতাম। কোনোদিন আমি হয়ত তারাপদর বাড়িতে রাতে শুচ্ছি। বলতে পারতাম একে অপরকে – দ্যাখ, এটা হয়নি। এই শব্দটা এই হলে ভালো হত। বা এই লাইনটার বদলে এটা হলে ঠিক হত। সুনীল সারাক্ষণই আমাদের বলেছে, এবং আমরাও বলেছি। প্রথম প্রথম সংকোচ হত। তবে আমাদের ব্যপারটা আলাদা ছিল। গোষ্ঠীবদ্ধ ছিলামনা। আমাদের নিয়মিত বসা, জড়ো হওয়া, একটি ঘর ঠিক করে সেখানে সভাসমিতি ডাকা, কোনও প্রশ্ন উঠছেনা। খুব ব্যক্তিগত ছিল। গভীর গোপন। নিজের একটা লেখা নিজে কাউকে পড়ে শোনাবো, এ আমাদের ভাবনার বাইরে। লিখে ফেলে রাখতে হবে। অনেকদিন পর হয়ত আবার পড়লাম। খাতায় রয়ে গেলো। আবার পড়লাম। এইভাবে আমাদের লেখা হত। নিজের লেখা নিজে পরব এটা আমরা ভাবতে পারিনি। এটা ভীষণ লজ্জার ব্যপার। ওই হয়ত টেবিলের ওপর ভাঁজ করে রাখা কাগজ রেখে বলেছি – পড়। তখন আমাদের ব্যক্তিগত প্রচারের ইচ্ছেটা খুব কম ছিল। প্রচারধর্মী একটা সাহিত্য জগত যেখানে আমার ভয় করে। প্রচারের কথা ভেবে ভয় করে। এত প্রচারধর্মী হলে আমরা ভাববো কখন? আমাদের মুখটা বাইরের দিকে হয়ে যায়। ও কি বলছে, ও কি বলছে, ও কি বলছে। ফেসবুকে এখন লাইক দেয়। আনলাইক বা ডিসলাইক দেওয়ার জায়গা নেই কিন্তু। কেউ কেউ একটা পোষ্ট করে আকুল হয়ে থাকেন। কটা লাইক পড়ল। আমি যত দেখি এই প্রচার ব্যাকুলতা তত আমার বুকটার ভেতরে একটা কষ্ট হয়। আমি সমালোচনা করছিনা। যখন যে যুগ। এখন গল্প উপন্যাসের সময় নেই। এখন অনুগল্পের যুগ। সময়ের সঙ্গে মানাতে হবে। হয়ত এখন যারা লেখেন তারা আরও ভালো লিখতে পারতেন। আরও মনোযোগ দিতে পারতেন। আরও সূক্ষ্মভাবে ভাবা হত। এত বড় দলে পড়া হয়না। আলোচনা হয়না। এ তো সভা! সবাই বলে বাঃ, বেশ!  আমি মনের কথা বলছি আপনাদের। পরস্পরের পিঠ চাপড়ে কোনও সাহিত্য হয়না। আপনাদের মধ্যে যারা যারা সত্যি সত্যি লিখতে চান, তারা নিজের মধ্যে একটু ডুব দিন। বহির্মুখী হলে কখনও কোনও শিল্প চরম সত্যে পৌঁছয়না। যারা অন্তর্মুখী তারা অনুভব করতে পারে। বহির্মুখী হলে আমি যে কতটা দিতে পারি তা বোঝা হয়না। বুঝতে সুযোগ দেয়না আমাদের বন্ধুরা। পাঁচটা কবিতার বই সামনে খুলে পড়ে পড়ে একটা চমৎকার কবিতা লিখে ফেললাম। এটা চলে না। নিজে নিজেকে বলতে হবে। নিজের মানোন্নয়ন খুব জরুরি। আত্মতৃপ্তি থাকলে আমরা বড় জোর দোতলায় উঠতে পারি। কুড়িতলায় ওঠা আর হবেনা। আত্মতৃপ্তি বিষ। সেটা একটা মুহূর্তের। আমি একজন বয়স্ক মানুষ হিসেবে মনে করি যে আমাদের সময় এটা ছিলনা। আমরা খুব সৌভাগ্যশালী। বকুনি খেতাম আবার লিখে আনতাম। এবার ভালো হচ্ছে? হ্যাঁ এবার ভালো হচ্ছে। একটা গভীর আত্মবিশ্বাস থাকলে সমালোচনা গায়ে লাগেনা। যদি কেউ নিন্দে করে সেটাও বুঝতে পাড়া যায়, যে এ নিন্দে করছে, সমালোচনা করছেনা। আজ এ পর্যন্তই থাক। আবার কথা হবে, আলোচনা হবে। ভালো থাকুন সকলে"
এবার আসি গল্প বৈঠক প্রসঙ্গে। 




 গল্পবৈঠক সমমনস্ক কিছু লেখকদের একটি বৈঠক যেখানে পরস্পরের গল্প পাঠ ও আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের দুর্বল ও সবল জায়গাগুলো উপলব্ধিতে আসে। এবং অগ্রজ সাহিত্যিকদের পরামর্শে নিজেকে আরও কিভাবে উন্নত করা যায় সেই নির্দেশও ধারণা হয়। একে ঠিক সভা সমিতি বলা চলেনা। এখানে কোনও পুরষ্কার প্রদান হয়না। হয়না কোনও পত্রিকা প্রকাশ বা বই সংকলন।  আমাদের শ্রদ্ধেয় শ্রীমতী কণা বসুমিশ্র ছিলেন আলোচকের ভুমিকায়। তাঁর সহকারী ছিলেন তৃষ্ণা বসাক।  গল্পের  আলোচনায় আসি। পারমিতা মুন্সীর গল্পে পলাশ চরিত্রটি মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারের শিকার। কল্পিত চিঠি ও চিঠির প্রত্যুত্তরে গল্পের উন্মচন। শেষ পরিণতিতে সমাজের নানা প্রতিকুলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার কষ্ট স্পষ্ট হয়। তমালি রায় পরিবেশন করলেন দুই সমকামী যুবকের একজনের রূপান্তরকরণ ও বিয়েতে পরিণতি। সত্য ঘটনা অবলম্বনে। এ এক ইচ্ছাপূরণের গল্প। শ্বাশ্বতী সরকারের গল্পে এক নারীর আত্মসংলাপ। সারাটা জীবন যেখানে অসুস্থতা ও মৃত্যু ছায়া ফ্যালে। দূরত্ব বাড়ায় আত্মজনের সঙ্গে। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্পে অপরাজিতা দেবী যদি সত্যিই মেলের উত্তরটি দিতেন তবে মনে এক আশা জাগত। আহা যদি সত্যিই এমন হত! বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্পে মৃত্যুতেই একটি প্রেমের আভাস রয়ে গেলো। যে রয়ে গেলো তার মনে চিরকালীন এক অনুভূতি থেকে গেলো। কৃষ্ণা দাসের গল্পে দিদিমাকে নাতনির উপহার একটি মোবাইল। যার সুত্রে বৃদ্ধ বয়সে দিদিমার এক বৃদ্ধ বন্ধু হলেন। বয়সকালের একাকিত্বে মোবাইলের ইতিবাচক ভূমিকাটি সকলেই পছন্দ করলেন। রজতশুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প এপ্রিল ফুল। একে গল্প না বলে রম্যরচনা বলা চলে যা নিজগুনে মনোহরণ করে। জয়া চৌধুরী মুলত হিস্পানিক সাহিত্যের অনুবাদের কাজ করেন। তাঁর পঠিত গল্পটি অদ্ভুত তীব্র তরঙ্গ সৃষ্টি করে মনে। তাকে ধন্যবাদ এইসব সৃষ্টিকে তুলে ধরার জন্য। মহুয়া মল্লিকের গল্পে সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনার ছায়া। সে বড় কষ্টের। সেই কষ্ট থেকেও এক মহৎ অনুভব জাগে। ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পে পরকীয়ার আকর্ষণ থেকে ফিরে আসা একটি মেয়ের কথা। নিত্যদিনের হরেক দায়িত্বের সঙ্গে জড়ানো মায়া। ভারী সুন্দর। যশোধরা রায়চৌধুরীর গল্পে এক অসুস্থ মানুষের কথা। যিনি দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হাসপাতালে। স্মৃতি হাতড়ে মনে করছেন কিছু। একটি শুকনো লঙ্কার অনুসঙ্গে ফিরে এলো স্মৃতি। অসুস্থ মানুষটির ও লেখকেরও। অতনুপ্রজ্ঞান বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প জন্মান্তর। মাছ হয়ে যদি জন্মাই! কিন্তু ফিরে আসতে কি সত্যিই ইচ্ছে করে? বিশেষত সত্যিটা যখন এমন দুঃখের।

শ্রোতার আসনে ছিলেন গল্পবৈঠকের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক, অগ্রজা গল্পকার, ঔপন্যাসিক পাপিয়া ভট্টাচার্য। 

এমনই নানা গল্পের সম্ভারে জমজমাট হয়ে গেলো সেদিনের বৈঠক। আগামী বৈঠকের প্রতীক্ষায় তাই। 
  



প্রতিবেদনঃ অনিন্দিতা মন্ডল  

৪টি মন্তব্য:

  1. চমৎকার ও মূল্যবান রিভিউ হয়েছে অনিন্দিতা। নবনীতাদির কথাকটি ভবিষ্যতের লেখকদের ব্যকরণ বই হয়ে থাকবে।
    বাকী সব কিছুই নিপুণ কভার করলে। ধন্যবাদ

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. তোমার ভালো লেগেছে বলে আমারও আনন্দ হলো । নবনীতাদির কথাগুলো বড় মূল্যবান । মেনে চলতে পারার চেষ্টা করতেই হয় ।

      মুছুন