Tuesday, April 17, 2018

"গল্পবৈঠক-২০" ২য় বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান

  
আমন্ত্রণ পত্রঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত 

“মধুর তোমার শেষ যে না পাই, প্রহর হল শেষ” রবীন্দ্রসঙ্গীতটি বড় সুন্দর প্রকাশ করেছিল সেদিনের গল্প বৈঠকের রূপটিকে । চৈত্রের প্রহর শেষের শেষবেলায় কলকাতা সেদিন উপচে পড়েছিল গড়িয়াহাটের সেলে । পরদিন যে বাঙ্গালির প্রিয় ১লা বৈশাখ ! সেই ভিড় পেরিয়ে একটু এগোলেই বাসন্তীদেবী কলেজের পাশে “আমন্ত্রণ” বুটিকের তিনতলায় সঞ্চারী চক্রবর্তীর বাড়ির সুসজ্জিত ছাদে বসেছিল গল্পবৈঠকের দ্বিতীয় বর্ষপূরতি ও বিংশতিতম অনুষ্ঠানের আসর ।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই বৈঠকের আহ্বায়িকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় দু কথায় বললেন গল্প বৈঠকের উদ্দেশ্য, তার গত উনিশটি বৈঠকের পথচলা ও আগামীদিনে কিভাবে তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চান এই বৈঠককে । সমবেত হাততালির মধ্য দিয়ে শুরু হল অনুষ্ঠান । সেদিন বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠান বলে গল্পপাঠ ছাড়াও ছিল সঙ্গীত, শ্রুতিনাটক, কবিতা ইত্যাদির আয়োজন । গল্পবৈঠককে ভালবেসে হাজির ছিলেন অনেক দর্শক শ্রোতা বন্ধু । ছিলেন পৃথ্বীশ মুখোপাধ্যায়। ছিলেন প্রখ্যাত লেখিকা কঙ্কাবতী দত্ত । যোগ দিয়েছিলেন সাহিত্যিক পাপিয়া ভট্টাচার্য, তৃষ্ণা বসাক প্রভৃতি আরো অনেকে ।
এবারের অনুষ্ঠান যেহেতু দীর্ঘ, তাই সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছিল ২৫০ – ৩০০ শব্দের মধ্যে “রক্ত না ঝরা রহস্য” এই বিষয়ের ওপর অনুগল্প লেখার জন্য । অত্যন্ত ছোট পরিসরে এবং রক্ত না ঝরিয়ে অর্থাৎ No violence – No bloodshed করে রহস্য গল্প লেখা যথেষ্ট কঠিন কিন্তু আজ হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি – তাই হাসিমুখে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন লেখকরা ।
প্রথমেই ছিল ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুললিত কন্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত । এরপর সঞ্চালিকা মৌমিতা ঘোষ পড়লেন তাঁর লেখা স্বরচিত সুন্দর একটি কবিতা ও ডেকে নিলেন প্রথম গল্পকার মহুয়া চৌধুরীকে । গল্পের নাম “রহস্যটা সামনে ছিল” । পারিবারিক সম্পত্তি একটি হীরের আংটি চুরি গেছে । অনেক অপরাধের রকম দেখলেই বোঝা যায় এর মধ্যে পরিচিত বা বাড়ির কেউ যুক্ত । এই সুত্র ধরেই শুধু বুদ্ধি দিয়ে কি ভাবে এর সমাধান করলেন হাবু কাকু তাই নিয়েই গল্প । লেখিকার সহজ, ঝরঝরে লেখনীর পরিচয় পাওয়া যায় এই লেখায় ।
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে চা, আম পোড়ার শরবত, গরম শিঙ্গাড়া – আপ্যায়নের কোন ত্রুটি ছিল না । সেগুলি সহযোগে আবার ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠে দুটি সুললিত রবীন্দ্রসঙ্গীত । শেষ গান “আজি যে রজনী যায় সখী ।“ গানের অভিঘাত কানে বাজতে লাগলো দীর্ঘক্ষণ ! তারমধ্যেই মৌমিতার কবিতা পেরিয়ে গল্প পড়তে এলেন শর্মিষ্ঠা ঘোষ । গল্পের নাম “কফি @ সি সি ডি” । গল্পটির মধ্যে থ্রিলার চলচিত্রের বীজ লুকিয়ে আছে । দু চারটি কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ঘটনার ঘনঘটার মধ্যে হঠাত শ্রোতাকে নিয়ে ফেলেছেন গল্পকার । রুদ্ধশ্বাস গল্পটিতে অপরাধী যখন মনের মানুষ, তখন বিবেকের টানাপোড়েন লেখক দেখাতে চেয়েছেন । গল্প আর একটু পরিসর পেলে হয়তো আরও ভালো হত।
এরপর স্বরচিত কবিতায় নিজে সুর দিয়ে এক নতুন রূপে পাঠ করলেন তমালী রায় । কবিতা ও সুর দুটিই সুন্দর ।


এদিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শ্রুতিনাটক । পরিবেশন করলেন “ঊচ্চারণের” তরফ থেকে সুস্মেলী দত্ত, সোমা ঘোষ ও কস্তুরী চট্টোপাধ্যায় । শ্রুতিনাটকের নাম “আমি জেনে শুনে বিষ করেছি পান” । রবি ঠাকুরের মানস প্রেমিকা রানু, সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মানসী নীরা ও এক আধুনিকা রীনার পারস্পরিক কথোপকথন ও তাদের মনোজগতে নিয়ে গেলেন এঁরা – মুন্সিয়ানার সঙ্গে । নতুনত্ব ছিল বিষয় ও পরিবেশনে ।
আবার গল্পে ফিরে আসা । গল্প পড়লেন ডঃ সোনালী । নাম “গল্পের মধ্যেখানে”। এক অদ্ভুত পরাজাগতিক অনুভুতি, মনাস্ট্রি, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জগত, মিশরের রাস্তাঘাট, শেষে জীবন্ত ড্রাগনের হাতে মৃত পান্নাচোর। স্বল্প পরিসরে  অত্যন্ত লিরিকাল গল্পটি মুহূর্তে আমাদের নিয়ে গেলো অন্য এক জগতে । 
এরপর গল্প পরিবেশন করলেন তপশ্রী পাল । গল্পের নাম “খাদ্য রহস্য”। আমাদের মধ্যে আজ জাতপাত, ধর্মের কত ভেদাভেদ – অথচ শিশুরা এইসব ভেদের কত ওপরে । কেমন করে বাড়ির খাবার দাবার হঠাত হঠাত উধাও হয়ে যাওয়ার রহস্য সমাধান হল একটি শিশুর কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে তাই নিয়েই গল্প । কোন রক্তপাত, কোন হিংসা না দেখিয়েও রহস্য গল্প লেখা যায় ও লেখা প্রয়োজন – একথা আয়োজিকা ইন্দিরা আবারো জোর দিয়ে বললেন এই গল্প পাঠ শেষে ।
অদ্বিতীয়া পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদিকা মৌমিতা তারণ যে রহস্য গল্পটি পড়লেন তার নাম “পাচার” ।  


স্প্যানিশ অনুবাদ
জয়া চৌধুরী এদিন পড়লেন মৌলিক গল্প “পৌষালির বন্ধু” । ড্রাগের নেশা আমাদের শিক্ষিতদেরও কেমন ভয়ঙ্কর ভাবে গ্রাস করছে , ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত পুরুষ মহিলা নির্বিশেষে । সেই ভয়দায়ক বিষয়টি তুলে এনেছেন লেখিকা । কে ছিল বাড়িতে আশ্রিত সেই ব্যাক্তি? শেষ পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখে গল্পটি ।
জয়তী রায়ের গল্পের নাম “দাদুর রোগ” । দাদুর পেটমোটা হোমিয়প্যাথির বাক্স থেকে কি কি আবিষ্কার করলেন কাকা আর কিভাবেই বা ধরা পড়লো দাদুর রোগ তাই নিয়েই ছোট্ট মিষ্টি গল্প জয়তীর । আমাদের অনেকের বাড়িতেই লুকিয়ে আছেন এরকম অনেক শখের গোয়েন্দা দাদা কিম্বা কাকা – বাঙ্গালীর মনের মধ্যে যে ফেলুদা বাসা বেঁধেছে সেই কবে !
শুনলাম কৃষ্ণা দাসের গল্প “একটি সজীব হত্যার পূর্বে” । মড়ার পচা দুরগন্ধ থেকে কিভাবে গল্প গিয়ে পৌঁছল একটি ফুলে ! তাই তো বলা হয় “ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন” ! সত্যিই বৈচিত্রে অনন্য ছিল এবারের গল্পবৈঠকের গল্পগুলি।
এরপর আমাদের সেদিনের হোস্ট সঞ্চারী শোনালেন “দূরে কোথায় দূরে দূরে – “ মুহূর্তে জমজমাট গল্পের আসর থেকে মন উদাস হল সুদূর গগনে মেঘেদের সাথে । মনকে আবার ফিরিয়ে আনলেন ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর গল্প “টক্কর” । অধিবেশনের অন্যতম কৌতুহলোদ্দীপক গল্পটিতে বিবদমান স্বামী স্ত্রী অরিন্দম ও পৃথা । স্বামীর ব্যাবহারে চুড়ান্ত আহত হয়ে স্ত্রী আলাদা থাকেন । কিভাবে শঠে শাঠ্যং হল – স্বামীর ওপর শোধ নিলেন স্ত্রী, তাই নিয়েই গল্প । লেখিকা দেখিয়েছেন মানুষের মনোজগতের বিভিন্ন টানাপোড়েন, গল্পে আছে রহস্য, সঠিক সুত্র ধরে তাঁর সমাধান । বহুমাত্রিক গল্পটির বড় গল্প বা উপন্যাস হয়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রচুর ।
নন্দিনী সেনগুপ্ত শোনালেন আর একটি অত্যন্ত সুন্দর গল্প । গল্পের নাম “যৌগিক পত্র” । কিভাবে ড্রাগের নেশা আক্রমণ করছে আমাদের কৈশোরকে সেই বিষয়টি আবার ঊঠে এসেছে এই গল্পে । কিভাবে স্কুলের জন্য যৌগিক পত্র তুলতে গিয়ে কুমু আবিষ্কার করে ক্যানা”বিষ” আর বাঁচায় তাঁর দাদাইকে? শেষ অবধি টানটান হয়ে শোনার মত গল্প ।
কৃষ্ণা রায় শোনালেন গল্প “বারুদ” । লেখিকা রহস্যের মোড়কে আবার আমাদের টেনে নিয়ে গেলেন সামাজিক বহু আলোচিত একটি বিষয়ে । মা এর ছেলের ওপর অধিকার বোধ ও ভালোবাসা মাত্রা ছাড়ালে কিভাবে নষ্ট হয় ছেলের জীবন ।
সবশেষে গল্প পরিবেশন করলেন গল্পবৈঠকের আহবাহিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় । গল্পের নাম “দইমাছ”।
কিশোর গোয়েন্দা পুপুল কিছুতেই বুঝতে পারে না ফ্ল্যাট বাড়ির সদর দরজা খুলে এক ভদ্রলোক অত রাত্রে রোজ যান কোথায় গাড়ী নিয়ে । এই কৌতুহল দমন করতে না পেরে বাবাকে ওই গাড়ির পিছু ধাওয়া করতে বাধ্য করল পুপুলের গোয়েন্দা মন । কিন্তু কি আবিষ্কার করল পুপুল? আমাদের একটু উদ্বৃত্ত কত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে সেটিই এই মননশীল গল্পের উপজীব্য ।
গল্পের শেষে একের পর এক গান চলল রাত বাড়ার সাথে সাথে – কখনো রবীন্দ্রসঙ্গীত, কখনো দ্বিজেন্দ্রগীতি, লোকগীতি, আধুনিক  শোনালেন সঞ্চারী, ওয়েলস, মৈত্রেয়ী বণিক, জয়িতা রাহা প্রভৃতি সঙ্গীতশিল্পী । সুন্দর কীবোর্ড ও গীটার ছিল সঙ্গে । 



সুদূর রায়গঞ্জ থেকে গল্পবৈঠকের জন্মদিনে কেক নিয়ে এসেছিলেন কবি শর্মিষ্ঠা ঘোষ । কেক কাটলেন অগ্রজ সাহিত্যিক গল্পকার পাপিয়া ভট্টাচার্য । সবশেষে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গান “আমায় ডুবাইলি রে আমায় ভাসাইলি রে” আর সঙ্গে  ডঃ সোনালির নাচ সত্যি আপ্লুত করল, ডোবাল, ভাসাল আমাদের আবেগ আর অনুভূতিকে । একটি না ভোলার মত সন্ধ্যা উপহার পেলেন উপস্থিত সবাই । এই আনন্দের মাঝেও আমাদের মধ্যে সেদিন পেলাম না গল্পবৈঠকের সাথী গল্পকার নিবেদিতা ঘোষ মারজিত, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, মহুয়া মল্লিক, অনিন্দিতা মন্ডল ও আরো কয়েকজনকে । তবে এদের সবার লেখা ধরা রইল বৈশাখী প্যাপিরাস ই-পত্রিকার পাতায় ।


রিভিউ লিখলেনঃ তপশ্রী পাল   
ছবি সৌজন্যঃ পৃথ্বীশ মুখোপাধ্যায়
      
সংবাদনজর, বুধবার  ১৬ই মে ২০১৮ 

এইসময় শনিবার, ২১ শে এপ্রিল ২০১৮

 

1 comment: