Wednesday, July 25, 2018

কিশোরদের জন্য আয়োজিত গল্পবৈঠক ২১ @ দেবভাষা, গোলপার্ক


লকাতার গলিপথ জুড়ে তখন বিকেলের খেলা। তারই এক পাশে শুরু হল ‘গল্প বৈঠক’এর ২১ তম বৈঠক। সেদিন ছিল কিশোরদের জন্য স্বরচিত গল্পপাঠের আসর।
সমগ্র অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন শ্রীমতী সোনালী ভট্টাচার্য। সঞ্চালনার ফাঁকে ফাঁকে ছোটদের জন্য পদ্য, ছড়া অন্য মাত্রা যোগ করেছিল।
অতিথি গল্পকার শ্যামলী আচার্য পড়লেন "মেসি" নামে গল্প। স্বপ্নের ফুটবল মাঠে শরণ্যার মেসিকে পাওয়ার গল্প বলেন। বিশ্বকাপ চলাকালীন এই গল্প রীতিমত রিলেট করলেন উপস্থিত সকলে। স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের নাম, "মিঃ টুসন এবং স্যার বিশালাক্ষী দন্ডপাট" । ছোটখাট লুজ বল থাকলেও কিশোর গল্প হিসেবে সার্থক।  ভাস্বতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অংক স্যারের ভাই’ গল্পটি ছোট্ট টুবলু-র প্রচণ্ড রাগী আর গম্ভীর অংক স্যার ও টুবলুর প্রণোদনায় তাঁরই লুক-অ্যালাইক এক পাগলের প্রতি তাঁর হৃদয় মুচড়ে ওঠার কাহিনী। ‘সেই চোখ’ ছিল তপশ্রী পালের ছোট্ট টানটান কিশোর থ্রিলার। নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত ‘মুগার উপাখ্যান’-এ শুনিয়েছেন এমন এক কাহিনী, যেখানে সকলকে টপকে অকস্মাৎ এক বিরাট অজগরকে পরাস্ত করার সুযোগ পেয়েও কীভাবে সেই লোভ সংবরণ করে মুগা বীরের মতো তাকে হেলায় ছেড়ে দিচ্ছে আগামী সম্মুখ সমরের প্রত্যাশায়। কৃষ্ণা দাসের ‘মায়ের দয়া’ ছোঁয়াচে পক্স আর তার সংক্রমণ নিয়ে, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কোনো বিশেষ অঞ্চলের উপভাষাসমৃদ্ধ সংলাপ সহ এক মা, তাঁর শিশু সন্তান ও পাঁচিপিসির মায়াবিদ্ধ গল্প। যশোধরা রায়চৌধুরী ‘দুষ্টুরা’-য় বটলা, জড়ুল, কুটকুটে, ইব্রাহিম ইত্যাদি আরও সব কে কে যেন আছে – তাদের প্রায় স্বচ্ছ ভারত অভিযান আর ‘বটলাকে মারলে জড়ুল কেঁদে ওঠে, এমনই বন্ধুত্ব’-র গল্প। বজ্জাৎ কিশোর বান্টি আর তার সাকরেদ, তস্য বজ্জাৎ এক পোষা ল্যাব্রাডর স্কুবি মিলে এক সকাল চুরমার করার মজাদার গল্প শোনালেন জয়তী অধিকারী। 

‘সম্বিতের সঙ্গে মাত্র দুদিন ডেট করেছি আর তুই সেটা মাকে বলে দিলি?’ – বর্ষা তার দুবছরের ছোটো বোন দিঠিকে বলল একথা, আর শুরু হয়ে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হয়েও শেষ হল না বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের কিশোর গল্প ‘প্রেম’। এখনকার কিশোররা এইসব অত্যাধুনিক সংলাপে যথেষ্ট অভ্যস্ত তাই গল্পটি বাস্তবিক ভাবে সফল। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় খুব সুন্দর একটা গল্প পড়লেন – ‘মিতুলের জলরহস্য’। নয় বছরের ছোট্ট মিতুল একদিন দুপুরবেলা, ঘরের ভিতরে চুঁইয়ে নামা বৃষ্টির জলের উৎস খুঁজতে গিয়ে পেয়ে গেল তার দাদুর হারিয়ে যাওয়া কবিতা লেখার খাতা এবং গল্প এগোল সিনেমার ফ্ল্যাশ ব্যাক ফ্ল্যাশ ফরোয়ার্ড টেকনিকেই।

এই সব পাওয়া হল গত ১লা জুলাই, ২০১৮ বিকেলে ‘দেবভাষা’ নামক একটি মনোরম বই বিপণীতে। দক্ষিণ কলকাতার গোলপার্কের বই আর শিল্পের আবাস এটি। ছিল শ্রীমতী অনিতা মুখোপাধ্যায় এবং শ্রীমতী সুতপা গুপ্তের গলায় মন ভালো করা বর্ষার রবীন্দ্রাগীতি। বিনা যন্ত্রানুসঙ্গে হৃদয়ে মোচড় তোলা গান। এমন ঘরোয়া বৈঠকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিশিষ্টতা হল, প্রতিটি গল্প পাঠের পরেই গল্পটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও প্রাসঙ্গিক কথোপকথন। এদিনের গল্প পাঠের বিষয় ছিল লেখিকাদের লেখা ছোটোদের গল্প। আলোচনায় উঠে এল প্রশ্ন – ছোটোদের গল্প মানে কি ছোটোদের জন্যে গল্প, নাকি ছোটোদের নিয়ে গল্প? কবি কিংশুক মণ্ডল ও প্রকাশক পলাশ বর্মন, আলোচনার দায়িত্ব সামলাবার চেষ্টা করলেন অত্যন্ত যথা যত ভাবে। আড্ডার মাঝে মাঝে গল্পের নির্মাণ, তার ভাষা বা শৈলী নিয়ে সামান্য সংশোধনবাদী ফুট কাটাও হল । আর ছিল দুই খুদে কিশোরী, আগমনী এবং স্বাতন্ত্র্রী।  যাদের সুচিন্তিত মতামত গল্পগুলি কে আরও মাত্রা দিল। গল্পের ভালোমন্দ বিচার করেছে তারাও। লেখকদের শুধরনর জায়গা তৈরি হল তাদের জন্য।
শেষে বিস্মিত চোখে ঘুরে ঘুরে দেখলাম দেবভাষার শিল্পের আবাসে স্থিরচিত্রের প্রদর্শনী, যেখানে একদিন ক্যামেরায় চোখ রেখেছিলেন দেবাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। যাঁকে যৌবনের শুরুতেই অকারণ ডেকে নিয়ে গেছে মৃত্যু। তাঁর বিষয়ে শুনলাম তাঁর মা, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপিকার  কথা। শেষের চা, মিষ্টি আর আন্তরিকতায় ঘন এমন যাপন বেশ মনে রয়ে যায়। 






রিভিউ লিখলেন কবি, প্রকাশক পলাশ বর্মণ (কলিকাতা লেটার প্রেস)