Wednesday, November 14, 2018

গল্প বৈঠক ২৪, রূপশালীর ১০ বছর পূর্তিতে

রূপা মজুমদার ও চুমকি চট্টোপাধ্যায়


আমন্ত্রণপত্র ডিজাইন করলেনঃ নন্দিনী সেনগুপ্ত
শিশুদিবসের প্রাক্কালে রূপশালীর ১০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান হল দক্ষিণ কলকাতার শরত বাসভবনে। সেই উপলক্ষে আমন্ত্রিত ছিল গল্পবৈঠকতাঁদের ২৮ তম গল্পপাঠ নিয়ে। বেশ কিছু গল্প ছড়া আর এক সুন্দর আলোচনা চক্র নিয়ে সুচারু অনুষ্ঠানটি হয়ে গেল ১২ই নভেম্বর, ২০১৮য়।
ছিলেন রিনা গিরি রূপশালীর তরফ থেকে আর ছিলেন সাহিত্যিক ইন্দিরা মুখোপধ্যায় যার অসীম উৎসাহ ও উদ্দীপনা দিয়ে গড়ে তোলা গল্পবৈঠক আজ শুধু এক গল্পের আড্ডাই নয়, বরং গল্প অনুশীলনের এক সুন্দর সাবলীল চারণভূমি।
অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল নির্ধারিত সময়েই মরদান হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী  অনুষ্কা দাশগুপ্তর গান দিয়ে। অনুষ্কা প্রথমে আমাদের শোনাল অন্তরা চৌধুরীর বিখ্যাত গান "নাচো তো দেখি আমার পুতুল সোনা" এবং তারপর অত্যন্ত সাবলীল গলায় শোনাল "লাল নীল সবুজেরই মেলা বসেছে"। কিশোরী অনুষ্কার গানে মুগ্ধ যখন শ্রোতারা তখন সঞ্চালিকা জয়া চৌধুরী মঞ্চে ডেকে নিলেন কিশোরভারতীর সম্পাদক চুমকি চট্টোপধ্যায় ও শুকতারা এবং নবকল্লোলের সম্পাদক রূপা মজুমদারকে। বিশিষ্ট দুই অতিথি বক্তব্য রাখলেন অতি প্রাসঙ্গিক এক বিষয়ের ওপর -  "ডিজিটাল যুগে কিশোররা কি সাহিত্য পড়ছে?"

রূপা আমাদের শোনালেন আশার কথা। বললেন কিশোর সাহিত্যের ভবিষ্যৎ মেঘলা নয়। এখনও বহু কিশোর মোবাইল ফোন বা টিভির হাতছানি উপেক্ষা করেও বই পড়ে আর সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত যথেষ্ট কিশোর সাহিত্য সৃষ্টি হয়েই চলেছে।
চুমকি বললেন কিশোর সাহিত্যের ফর্ম পাল্টেছে হয়ত অল্প তবে কিশোর সাহিত্যের সংজ্ঞা পালটে যায়নি আজো। এও বললেন শহরের তুলনায়  মফস্বলে কিশোর সাহিত্যের পাঠক এখন অনেক বেশি। তার কারণ হিসেবে পাঠমাধ্যম থেকে শুরু করে গ্যাজেট নির্ভরতা এবং অতিরিক্ত ভিস্যুয়ালের ব্যবহারে শিশু মস্তিস্কের অলস হয়ে ওঠা সবই উঠে এসেছিল। তবে দুই সম্পাদক এবং দর্শকাসনের বন্ধুরা অনেকেই একমত ছিলেন যে ভাল পাঠক তৈরি সম্ভব তখনই যখন বাড়িতে ভাল পড়ার পরিবেশ এবং আগের প্রজন্মের ভালো পড়ার অভ্যাসের ছায়া পড়বে আগামীর মননে।
শ্রোতা সঞ্চালক ও অতিথিরা সবাই একাত্ম হয়ে এই আলোচনায় অংশগ্রহণ করায় সময় বয়ে গেল বড় তাড়াতাড়ি।
 
গল্প পাঠেঃ সুকন্যা সাহা, সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, পায়েল সেনগুপ্ত, দেবযানী বসু কুমার, মিতা নাগ ভট্টাচার্য, স্বপ্না বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত এবং ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

শুরু হল ছড়া ও গল্পপাঠের পালা। প্রথমে কবিতা শোনালেন সংস্কৃতি ব্যানার্জী। সুখপাঠ্য কবিতাটি আজকের দিনে বড় প্রাসঙ্গিক লাগে।অনুষ্ঠানের শুরুতে রিনা গিরির উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের উত্তরীয় গামছা দিয়ে বরণ করে নেওয়াটা নজর কেড়ে নেয়।
এর পর সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায় শোনালেন একটি ছোট ছেলের বোধবিভ্রাটের গল্প।  ছোট বেলায় বড়দের সব কথার মানে খুব স্পষ্ট থাকে না। তেমনই এক কথা থেকে এক ছোট ছেলের বোঝার ভুল আর সে ভুল ভাঙ্গার এ গল্প আমাদের অনেকের ছোটবেলাকেই মনে করাবে সম্ভবতঃ। 
দেবযানী বসুকুমার শোনালেন "পাড়াবেলা"র কথা যে বেলা আমাদের সকলের ছেলেবেলার সাথে জড়িত কিন্তু দুর্ভাগ্য যে এখনকার শিশুরা এ স্বাদে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রতিটি পরিবারেই। দেবযানীর আন্তরিক আর্তিটি যদি শিশুদের পাড়াবেলা ফিরিয়ে দিতে পারত তো  বেশ হত।
মিতা নাগ ভট্টাচার্য্য শোনালেন এক শিশুর গল্প যে আচমকাই এক চরম যন্ত্রণাময় সত্যর মুখোমুখি দাঁড়ায়। বাবার মৃত্যুসংবাদের যন্ত্রণা নিয়ে দুর্গার কাছে প্রার্থনারত শিশুটির কথা শুনতে শুনতে মন কেঁদে ওঠে। মিতা কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে স্বরচিত গল্পটি স্মৃতি থেকে বলে চললেন। 
স্বপ্না বন্দোপধ্যায় শোনালেন গল্পের ছায়ায় অনেক অজানা তথ্য দেশ বিদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসকে কেন্দ্র করে। গল্পের শুরুতে একটা চমকপ্রদ রেসিপি কিশোর কিশোরীদের অভিভাবকদের জন্য বেশ মিষ্টি চমক।
নন্দিনী সেনগুপ্তর লেখায় ফুটে উঠল  কিশোর মনের  মাধুর্য্য। স্কুল প্রজেক্টে ভাল নম্বর পাওয়ার আকাঙ্খা , প্রত্যাশা না পূরণ হওয়ার দুঃখ এবং সব শেষে আচমকাই কিশোর মনটির মধ্যে সাফল্যের খুশি ফিরে আসার এই গল্পও শ্রোতাদের শিকড় ছুঁয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "ভুলুরাম শর্মা"  ছড়াটি  শোনালেন কৃষ্ণা মজুমদার। ছড়াটি নিজগুণেই বড় মিঠে তায় তায় কৃষ্ণার পরিবেশনার গুণে  একবার শুনলে ভোলা অসম্ভব।
এর পর ছিল  সুকন্যা সাহার লেখা এক কিশোরের গল্প যে স্বপ্নে বেড়িয়ে আসে ২০৪০ সালের কিছু মুহূর্ত ছুঁয়ে। গল্পটি শুনতে শুনতে মনে হয় সত্যিই হয়ত ২০৪০ সালের কিশোর কিশোরীরা বড় একলা হয়ে যাবে। সত্যিই হয়ত মানুষের সব চেয়ে বড় বন্ধু সহায়ক এবং সঙ্গী হবে শুধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। যদি তাই হয় তো সে  আগামী বড় একাকীত্বের আগামী।
বুবুন চট্টোপধ্যায় শোনালেন  এক  কিশোরীর গল্প  যে তার জন্মদিনে পেয়েছে আস্ত একখানা ঘর সুন্দর করে সাজানো  আর তার পরদিনই  পেয়েছে এক বিশ্রী অভিজ্ঞতা যা হয়ত এক ঝটকায় কেড়ে নিল তার কৈশোর।
শিবানী পান্ডে মুগ্ধ করলেন দীপ মুখোপধ্যায়ের লেখা "কেয়ার অফ ফুটপাথ" ছড়াটি আবৃত্তি করে । এ  ছড়া সেই সব কিশোরদের নিয়ে যারা আমাদের শিশুপাঠ্য  বইয়ের বাইরে এবং যাদের শৈশব এবং কৈশোর হারিয়ে গিয়েছে সমাজের  যন্ত্রণার ফুটপাথে।
পায়েল সেনগুপ্ত শোনালেন দিয়েগো নামের ভারি মিষ্টি এক ছেলের গল্প যার পরিত্রাণ নেই বাবা কাকা মামাদের উচ্চাকাঙ্খার স্বপ্ন থেকে।
সবশেষে ইন্দিরা মুখোপধ্যায় অপূর্ব দক্ষতায় রূপকথায় মিশিয়ে দিলেন সৌরবিজ্ঞান। কিশোর কিশোরীরা এ গল্পটি একবার শুনলে সৌর বলয়ে গ্রহের অবস্থান এবং তাদের বাহ্যিক কিছু বিবরণ এবং পৃথিবী ছাড়া বাকী গ্রহদের মধ্যে বৃষ্টির হাহাকার আর কখনও ভুলতে পারবে না।
অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ ভাগে এসে রিনা গিরি শোনালেন স্বরচিত ছড়া।
শেষ পাতে ছিল পৃথা বলের গাওয়া রূপকথার মিশেলে ছড়ার গান। অপূর্ব এ উপস্থাপনা কিছুক্ষনের জন্য শ্রোতাদের ছেলেবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
আর এই সবের মাঝে ছিল জয়া চৌধুরীর টকঝালমিষ্টি মন্তব্য এবং কখনও সুচিন্তিত মতামতও।  অনুষ্ঠানের রাশ টানা ও ছাড়ার যে অনুপম দক্ষতা জয়া দেখিয়েছেন তা প্রশংসার দাবী রাখে নিশ্চিতভাবে। 



গান গল্প ও ছড়ার ঠাসবুনোটের এই গালিচায় বসে দুদন্ড জিরিয়ে নেওয়ার অবসরটি সাজিয়ে দেওয়ার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ গল্পবৈঠকের সমস্ত লেখক পাঠক ও অতিথিদের। আর ছিল চা সিঙ্গারার আয়োজন। 

প্রতিবেদন লিখলেনঃ সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়  

যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক 

No comments:

Post a Comment