বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

গল্প বৈঠক -৩৪ @ স্কুলডাঙা, বাঁকুড়া

 গল্পবৈঠকের ৩৪ তম আসর বসেছিল বাঁকুড়ার স্কুলডাঙায়। আর্ষ পত্রিকার দফতরে। রবিবারের মধ্যাহ্নভোজের পর সুখঢেঁকুর তুলতে তুলতে দুপুর ঘুমের হাতছানিকে প্রশ্রয় না দিয়ে হাজির হয়েছিলেন স্থানীয় মানুষজন। সেদিন উপস্থিত ছিলেন মোট আটজন গল্পকার।  গল্পের আলোচনায় ছিলেন আর্ষ পত্রিকার সম্পাদক মধুসূদন দরিপা এবং গল্পবৈঠকের পক্ষ থেকে হাজির ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটিকে একসুতোয় পরিচালনা করেছিলেন বাঁকুড়ার লেখক ভজন দত্ত। সঞ্চালনায় ছিলেন শ্রাবন্তী বটব্যাল। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কবি উমা মাহাতো এবং প্রাবন্ধিক বিপ্লব বরাট প্রমুখরা। 

অনুষ্ঠানের শুরুতেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় সদ্য প্রয়াত নবনীতা দেব সেন কে নিয়ে স্মৃতিচারণা করলেন। তাঁর জন্য এক মিনিট নীরবতা পালন এবং একটি সঙ্গীত পরিবেশনার পরেই শুরু হল সেদিনের গল্পপাঠ।  
সেদিনের প্রথম গল্পকার ছিলেন গল্পলোক পত্রিকার সম্পাদক এবং লেখক রামামৃত সিংহ মহাপাত্র।  তাঁর "দেবী" গল্পটির থিম বহুচর্চিত। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এখনো মেয়েদের ভর হওয়া, ডাইনি বানিয়ে দেওয়া বা তা থেকে তার দেবীতে উত্তরণ নতুন কোনো ঘটনা নয় কিন্তু আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট প্রয়োগে এবং লেখনশৈলীর মুন্সিয়ানায় অন্যরূপে যেন ধরা দিল গল্পটি।গল্পটি শুরুতেই মাত। "ভর করলে তুই মানুষ থাকুস নাই, দেবতা হয়ে যাস" সংসার পেতেও সুখ হয়নি পুতুলের। একে একে বাপী, বাদল সবার জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে ঘর ছেড়ে বাবার কাছে চলে এসেছিল সে।  তারপর কিভাবে যেন সবাই মিলে পুতুলের মধ্যে ভর হওয়া এবং তার থেকে রোজগারের একটা দিশা দেখতে পায়। মানে পুতুল কে ব্যাবহার করে গ্রামের লোক এবং সেই সঙ্গে তার বাড়ির লোক‌ও। যেন নিজে দেখেশুনে বিয়ে করে ঘর করতে পারোনি এবার কাজে লাগো একটু। সেইখানেই গল্পটি সার্থক।  
  
পরের গল্পকার রম্যলেখক পার্থসারথি গোস্বামী। গল্পের নাম "টার্গেট"। লেখক যে রম্যরচনাই লেখেন তা বেশ বোঝা যায়।  গল্পটি শুরু হয় ক্রিকেট ম্যাচ দিয়ে। এবার তার গতিময়তায় এবং গল্পের বুননে প্রতি ছত্রে ছত্রে হাসির খোরাক গল্পটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। আমাদের অতি পরিচিত ঘরগেরস্থালির কথোপকথন, শাশুড়ি বৌমার অভিযোগ, অনুযোগ এবং গৃহকর্তা বাড়ি ফেরার পরেই সেই চাপান‌উতোরের মধ্যে দিয়ে এগুতে থাকে গল্পটি।   এদিকে গৃহস্বামীর সেই বহু আশার ক্রিকেট ম্যাচটি যেন মনের দোরে কড়া নেড়েই চলে। তার মধ্যেই ছেলের পড়াতেও ভাটা। বেচারা গৃহকর্তা!  অথচ খামতি নেই তার ঘরণীর সিরিয়াল সর্বস্বতায় আর সেই সিরিয়াল থেকে গল্প বারেবারেই এসে বরের ক্রিকেট ম্যাচের ইন্টারেস্টিং মূহুর্তে রিলে করার তাড়না। খুব আটপৌরে টপিক কিন্তু আদ্যোপান্ত হাসির খোরাক গল্পটিতে।  

এরপরের গল্প বৈশাখী গুপ্ত"তেলের শিশি"। বেশ নতুন ধরণের গল্প। এক পরিবারের মায়ের মৃত্যু কে ঘিরে। মায়ের মরদেহ শ্মশানে দাহ করার মধ্য দিয়ে একটি অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিমায় কথোপকথন। সেই মৃত মানুষটিকে বারেবারে টেনে আনা প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে ডোমেদের সেই মড়া পোড়ানোয় কত টাকা রফা হবার মত অথবা মৃত গৃহকর্ত্রীর সংসারে ছেলের "ব‌উ" আনার ফলে তাঁর সংসারের মোড় ঘুরে যাওয়া অবধি  বিষয়গুলিও। সেই আলাপচারিতা যেন শুনতে পায় জ্বলন্ত চিতার মধ্যের মানুষটি। একদিকে দাউদাউ চিতার আগুণ অন্যদিকে রাস্তার টিমটিমে পথবাতির দপ করে জ্বলে ওঠা। সেই মূহুর্তেই মৃত মায়ের ছেলে আবিষ্কার করে পুরনো, চেনা "মা, মা" গন্ধটা।  তার মনের আলোড়নের ছবিটা নিটোল। প্রিয়জন আগুণে জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে যেতে যেতে মনের ভেতরের হাহাকার টের পায় সে।   মায়ের অস্থি ভাসিয়ে সে বুঝতে পারে মায়ের মর্ম। আবার তার পায়ে যখন টান ধরে,  তখন তার মায়ের বানিয়ে রেখে দেওয়া তেলটি‌ই সে ব্যাথার মোক্ষম ওষুধ, মালিশ করে দেওয়া হয় তার পায়ে। মা বেঁচে থাকতে সে তেলের মর্ম কেউ বোঝেনি আজ বুঝি সেই তেলের সার্থক প্রয়োগ হয়।  সেখানেই গল্পের নামকরণটি সার্থক।  

এরপর সংকল্প নামে একটি সাহিত্যপত্রের যুগ্ম সম্পাদক সাধনচন্দ্র সত্পথীর গল্প অস্তরাগ। এই গল্পে মধ্যজীবনের সংকটটি বেশ প্রকট ভাবে ধরা পড়ল। সুদেষ্ণার স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া দিয়ে শুরু হয় গল্পটি। সেই থেকে এক চরম সেন্স অফ ইনসিকিউরিটি এবং এক‌ই সঙ্গে স্বামীর প্রতি তার অধিকারবোধ তুলে এনেছেন লেখক।  যথারীতি আগের রাতে তুমুল ঝগড়া হয়ে বাক্যালাপ বন্ধ সুদেষ্ণা পরদিন প্রাতঃভ্রমণে গিয়ে সঙ্গিনীদের সঙ্গে হাসতে পারেনা, হাসাতেও পারেনা।  সুদেষ্ণার লেখক স্বামী  সুদেবের একনিষ্ঠ সাহিত্যচর্চার কারণেই সে ঝগড়ার সূত্রপাত। কেবলি স্ত্রী ভাবে সে একা হয়ে পড়ছে। তার প্রতি স্বামীর মনোযোগ নেই। মানে অ্যাটেনশন ডেফিসিয়েন্সি তে ভোগেন সুদেষ্ণা । আর সেই থেকেই জন্ম নেয় সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তাহীনতা। এই অবধি ঠিক ছিল সবশেষে সুদেষ্ণা কে খুশি করার জন্য, তার হাসিমুখ দেখার জন্য সুদেব যেকোনো মূল্যে তার  গল্প লেখার অভ্যাসটিকে প্রশ্রয় দেবেন না বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, এই বিষয়টা নিয়ে লেখক আরো ভাবতে পারতেন।   

এরপর  সংকল্প সাহিত্যপত্রের আরেক যুগ্ম সম্পাদক  সবিতাব্রত সিংহবাবুর "একটি রঙিন ছাতার গল্প" বিষয়ে বৈচিত্র্য না থেকেও সার্থক ছোটগল্পে উন্নীত। 
অভাবের সংসার। অসুস্থ বাবা। সুবর্ণ টিউশান পড়িয়েও চেষ্টা করে চলে। ভাবে একদিন দুর্ঘটনায় পঙ্গু বাবা ভালো হয়ে যাবে ঠিক। বাবা যেমন নিজের পায়ে আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারবেনা সেটাও যেমন ঠিক সুবর্ণ ও যে আবার পড়বে, চাকরী করবে সেই আশা নিয়ে বেঁচে থাকে মা। "দিশাহারা মানুষ স্বপ্নের মধ্যেই আবার দিশা খুঁজতে থাকে" সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইন এটি। 
মায়ের অসহায়তা, তাঁর বড় ছেলের আলাদ সংসার পাতা সবেতেই ভারাক্রান্ত মন ভালো দেখিয়েছেন গল্পকার।  
আরও একটি বাক্য বেশ মনে রাখার মত। "সম্পর্কগুলো ঘূর্ণীয়মান চাকার মতো আজ যে উপরে আছে কাল সে নীচে নেমে যাবে"                
আবার সেই টানাপোড়েনে সুবর্ণর ছাত্রী নীলার সঙ্গে তার মধুর প্রেমের দিকটাও বেশ ভাল লাগে। তবে শেষের দিকটা বড় দুঃখের। সেখানে  নীলার সঙ্গে অধরা প্রেমের দিকটা আরও নিপুণ করে দেখানো যেত। সুবর্ণর জীবনে ছাতা গুলি আর রঙিন হয়ে ওঠেনা। 
প্রথম বর্ষের ছাত্র হামিরুদ্দিন মিদ্যার গল্প "মায়ের জান" সম্পূর্ণ বাস্তবধর্মী একটি গল্প। মুসলিম সমাজে এখনো যে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে মুসলিম নারীদের দিনযাপন হয় তা বেশ সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন হামির। মেয়েরা যুগ যুগ ধরে মেনে নিচ্ছেন বারেবারে গর্ভধারণের মত বিষয়টিকে। এরূপ এক মা বারবার গর্ভধারণ করে ক্ষান্ত হন না। বরং গর্ভে সন্তান না এলেই তিনি অসুখী। কোল খালি থাকাটা যেন সেই মায়ের পক্ষে নিন্দনীয় অপরাধ। তাঁর সংসার যাপনের অপরিহার্য অঙ্গ হল সন্তানের জন্ম দেওয়া।ছাগলছানাদের দেখেও তার মা হবার সাধ জাগে।এহেন মা'টি যখন জানতে পারলেন যে বর্তমানে গর্ভ ভাড়া দেওয়া হয় তখন তিনি সেই পন্থাতেও মা হতে ইচ্ছুক, জানালেন সেইকথা।  তবে হামির‌উদ্দিনের বাক্যগঠন আরো উন্নত হোক। এখন সে সাহিত্যজগতে নতুন। তার কাছে আরো প্রত্যাশা র‌ইল আমাদের।  
    
পরের গল্প অনুষ্ঠানের আয়োজক, টেক-টাচ-টক পোর্টালের অন্যতম কর্ণধার ভজন দত্তের। গল্পের নাম "কানাঘুঘু"। অত্যন্ত সময়োপচিত এবং প্রাসঙ্গিক গল্প আজকের যুগে দাঁড়িয়ে। 
এখনকার জীবনে সবকিছুই খুল্লামখুল্লা। অনমিত্রের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মাধ্যমে উঠে আসে গল্প বলা। তার অফিস কলিগ আকাশ চরিত্রটি রয়েছে সেই প্রেক্ষাপটে। মুখ বুজে কিছু বন্ধুত্ব সহ্য করে যেতেই হয় তেমনি অনেকটা। অনমিত্র আকাশকে বলে যাচ্ছে, পাখি শিকারের কথা।অনিচ্ছা সত্ত্বেও শুনে যেতে হচ্ছে আকাশকে। এভাবেই গল্পের শুরুয়াত। অফিসের পদমর্যাদা, স্ট্যেটাসের মত কিছু অনুষঙ্গ এসে পড়ে গল্পে যা সুন্দরভাবে ফুটিয়েছেন লেখক। আকাশ জানে অনমিত্রের স্বভাব চরিত্র সম্বন্ধে। 
অনমিত্র কিন্তু এক ছদ্ম গাম্ভীর্য নিয়ে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে থাকেন না। স্বীকার করেন একের পর এক তার নারী সঙ্গের কথা। আকাশ সব বোঝে কিন্তু বুদ্ধি করে চলে।ঘাঁটায় না। একের পর এক এভাবেই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে পড়ে দুপক্ষ। এই বিস্তারিত বাক্যালাপের দিকটায় গল্পটির সুতো একটু হলেও ঝুলে গেছে বলে মনে হয়। 

"একি শুধুই লোভ! ভোগবাসনা! না কি কোথাও একটু ভালোবাসা!" এই বাক্যটিই যথেষ্ট ছিল সেখানে।  
এরপরেই মঞ্চে উড়ে আসে হাজির কানাঘুঘু। রমা নামের এক পাখীটিকে ধরার ফাঁদ পাতেন কণিকা নামে এক কনাঘুঘুর মাধ্যমে।   
আকাশ জানতে চায় কানাঘুঘুর অর্থ। কানাঘুঘু ব্যবহার করা হয় পাখি শিকারের বা ধরার জন্য। 
"শিকারিরা প্রথমে একটি পাখিকে পোষ মানায় প্রথমে, তারপর সেই পাখিটির চোখ কোনো কোনো শিকারি আবার অন্ধ করে দেয়।যেখানে পাখি ধরার ফাঁদ পাতে সেখানে পাখিটিকে পায়ে বেঁধে তার চারপাশে খাবার ছড়িয়ে দেয়। পাখিটা খায় আর ডাকে। তার ডাক শুনে অন্য পাখিরা এসে শিকারির ফাঁদে পড়ে।তারপর শিকারি ইচ্ছেমত পাখিগুলিকে জবাই করে।" এটি গল্পের উৎকৃষ্ট দিক। 
ওদিকে আকাশের স্ত্রী রীপাও যে অনমিত্রের ফাঁদে পা দিয়েছে এবং গল্পের শেষ মোচড় এটিই যেখানে আকাশের নিজেকে মনে হয় কানাঘুঘুর মত। গল্পটির মধ্যে উপন্যাসের বিন্যাস হলে আরও ভালো হবে। গল্পের প্লট হিসেবে সার্থক। 

লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের  "ঘুমপাড়ানি চাউমিন" গল্পটির শ্রবণ প্রতিক্রিয়া জানালেন ভজন দত্ত

"মা যখন শীতের রাতে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করতেন, আমরা আগুন থেকে নিরাপদ দূরত্বে বসে দেখতাম মা ভাতের হাঁড়ি থেকে একটা হাতায় করে কয়েকটি ভাত তুলে টিপে টিপে দেখে বলতেন,'ব্যাস হয়ে গেছে।' 

গল্পবৈঠক ৩৪ এ আমাদের বাঁকুড়ায় এসে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কাছে যখন 'ঘুমপাড়ানি চাউমিন' নামের গল্পটি যেই শুনলাম, তখন আমার মায়ের কথাই মনে হলো প্রথমে। ঠিক যেভাবে এই গল্পে মায়ের চাউমিন রান্নার গল্প বলছে টাপুর।ছোটরা কত নিঁখুতভাবে পর্যবেক্ষণ করে তা আমরা হয়তো কেউ খেয়াল করি না!গল্পচ্ছলে এই গল্প শুরু হলেও সমাজের এক ভয়ংকর বা বিভৎস রূপের পর্দা ছিঁড়ে এই গল্প যেন চোখে আঙুল দেওয়ার এক গল্প।কন্যাভ্রুন হত্যার কথা আমরা জানি অনেকেই। জানি, কন্যা সন্তান হলে এখনো তাদের নানাভাবে  মেরে ফেলার কথা।এই গল্পটি সেখান থেকে ১৮০° ঘুরে এক জীবনের কথা বলে এবং শেষ পর্যন্ত  ভালোবাসার কথা বলে।যে টাপুর জানে তার মা তাকে নর্দমা থেকে কুড়িয়ে এনে মানুষ করেছে,সেই যখন তার মায়ের কাছেই  জানতে চায় সত্যিটা, তখন টাপুরের মা সমাজের  যে নির্মম সত্যটি যেভাবে তুলে ধরেন তা পাঠককে, শ্রোতাকে স্তব্ধ করে এই গল্পের কাছে, গল্পের স্রষ্টার কাছে নত করে ভাবতে বাধ্য করে,সেখানেই গল্পকারের মুনশিয়ানা এই গল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের সমগ্র সৃষ্টিকে আমার জানার,পড়ার সৌভাগ্য হয়নি,সে আমার দুর্ভাগ্য। মায়ের ঐ ভাত দেখার মতোই বুঝতে পারছি, তাঁর সৃষ্টি, সৃজন কতখানি মর্মস্পর্শী হতে পারে। হাতে গোণা কয়েকটি শব্দের মধ্যে তাঁর যে খেলা, সেই খেলায় তিনি বিজয়ী এবং পাঠকও বিজয়ী। আমার সৌভাগ্য হলো দিদির মুখে দিদির লেখা একটি অসাধারণ গল্প শোনার।আরো শুনবো, পড়বো। ফুটন্ত ভাতের গন্ধেই এখন যে ভীষণ খিদে পাচ্ছে।  







সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

'গল্পবৈঠক' ৩৩ @ চন্দননগর





১৪ ই সেপ্টেম্বর, শনিবার "গল্পবৈঠক ৩৩" অনুষ্ঠিত হল শতাব্দ-প্রাচীন হুগলী জেলার চন্দননগর বঙ্গ বিদ্যালয়ে। 
চুঁচুড়া-চন্দননগরের বিশিষ্ট দশজন গল্পকার ও তিনজন অলোচককে "গল্পবৈঠকের" পক্ষ থেকে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। 

বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ স্কুলটির একতলার এক শ্রেণীকক্ষে, বাঁশবেড়িয়ার প্রখ্যাত গল্পকার নব বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র ভিত্তিক গল্প 'কোন এক হরেনকে নিয়ে' পাঠের মধ্য দিয়ে আড্ডার সূচনা হয়। লেখক এক্ষেত্রে হরেন ও সুখেন দুটি চরিত্র পাশাপাশি রেখে গল্পটি নির্মাণ করেছেন। গল্পটি নিয়ে আলোচক তার আলোচনায় বলেন, স্মার্ট গল্প। তবে গল্পে সুখেনের ইচ্ছার অপমৃত্যু ঘটেছে।

দ্বিতীয় গল্প 'পাঁচ নম্বর গোধূলি' পাঠ করলেন চুঁচুড়ার গল্পকার সিক্তা গোস্বামী। গার্হস্থ্য জীবনের অণু পরিবারের গল্প, যেখানে মা-বাবার বয়স হলে তাঁরা ব্রাত্য হয়ে যান সংসারে। তাদের ঠাঁই হয় বৃদ্ধাশ্রমে। শেষে অনিচ্ছা সত্বেও ছেলে তার মাকে জোর করে নিয়ে আসছে বৃদ্ধাশ্রমে, এই ছবি এঁকে লেখিকা পাঠকের কাছে প্রতিটি মা প্রতিটা ছেলের সামনে একটা আয়না তুলে ধরেছেন। আলোচক, গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র অশোক ও ঝর্ণার জীবনের ক্রাইসিসের শেষে ট্রাজেডিতে পরিণত হবার কথা বলেছেন। 

এরপর, চুঁচুড়ার প্রখ্যাত গল্পকার বিমল গঙ্গোপাধ্যায় গল্প পাঠ করেন। 'ছায়াসূর্য' নামের এই গল্পটিতে বাবা থেকে রাক্ষস, রাক্ষস থেকে মনুষ্যত্বে নেমে আসার এক ছবি এঁকেছেন। মায়ের আত্মহত্যা, বাবার নোটবই, তাতে ছায়ার খোঁজ, সবই স্বাভাবিক ছন্দে, অন্তরঙ্গ ধারায় বয়ে গেছে গল্পের গতির সাথে। কাহিনীর শেষে মৃত মায়ের ছায়া আর বাবার ছায়ার দূরত্ব কত তা নিরূপণের দায়িত্ব গল্পকার পাঠকের হাতে অর্পণ করে এক দার্শনিক পরিসমাপ্তি ঘটান। আলোচক তাঁর আলোচনায়, গল্পটির ভরবিন্দুর কথা, গল্পটি যে ট্র্যাজেডির তুঙ্গে পাঠকদের নিয়ে চলে গেছিল তা উল্লেখ করেন।

গল্পবৈঠকের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম তিনটি গল্প পাঠের শেষে সেই গল্প তিনটি নিয়ে আলোচক মানস সরকার আলোচনা করেন।

চতুর্থ গল্প 'পাগলী'। গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের স্বকন্ঠে শোনার অভিজ্ঞতা শ্রোতারা বহুদিন মনে রাখবেন সেই বিষয়ে সন্দেহ নেই। 'অষ্টুমী' নামের পাগলী চরিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে নিজেই নিজের দ্বারা লাঞ্ছিত একটি চরিত্র। শ্রোতারা গল্পটিতে লক্ষ্য করেছেন, চরিত্র সৃষ্টিতে লেখিকার সহানুভূতি, নারীর প্রতিবাদ, পুরুষের অনুভূতিহীনতার প্রতি লেখিকার ধিক্কার। আলোচক,  তাঁর আলোচনায় গল্পটিকে একটি বাস্তবের ছবির গল্প রূপে চিহ্ণিত করেন। তিনি গল্পের ভিতরের গল্পটিকে দেখিয়ে দেন তাঁর আলোচনায়। 

চুঁচুড়ার গল্পকার সুব্রত বসু  শোনালেন আসরের পঞ্চম গল্পটি- 'তবু অনন্ত জাগে'। একটি ট্রেন দুর্ঘটনায় বাবার মৃত্যুর সম্ভাবনা। মৃত(?) বাবাকে ভুল চিহ্ন দিয়ে সনাক্তকরণ করার জন্য ছেলে অনিরুদ্ধকে এক মানসিক টানাপোড়েন ও বেদনার মধ্যে দিয়ে যাত্রা করিয়েছেন লেখক। শেষে বাবার মতো করে বেল বাজানোর শব্দে চমকে ওঠে পরিবারের সকলে। আলোচক, গল্পটির আরো বিস্তারের সম্ভাবনার কথা ব্যক্ত করেন।

এরপর চন্দননগরের ভ্রমণপিপাসু গল্পকার নীতিশা রায়  'মায়াজাল' নামক একটি শহুরে জীবনের গল্প পাঠ করেন অত্যন্ত ধীর স্থির ও মৃদু কন্ঠে। নাম পরিচয়হীন কেন্দ্রীয় চরিত্রটির মধ্যে শ্রোতারাও যখন ধীরে প্রবেশ করছেন, ঠিক তখনি চরিত্রটি ঠিক যেভাবে নিজেকে সকলের থেকে দূরে রেখে একাকী জীবনে গল্পটির চরিত্র হয়ে উঠেছে সেভাবেই অনেক প্রশ্ন শ্রোতাদের মনে রেখে গল্পটি শেষ হয়ে গেল। আলোচক, গল্পটির রহস্যময়তার কথা ও গল্পটির চলনপথের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকের উপরোক্ত  চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ গল্পটি নিয়ে তাঁর সুচিন্তিত মতামত দেন সাহিত্যিক, সুআলোচক গৌর বৈরাগী মহাশয়।

আসরের সপ্তম গল্প কাকলি দেবনাথের 'নিরাশার আশা' একটি আবেগ প্রধান গল্প। গল্পের নিরাশাবালার চরিত্রটি নির্মমভাবে আহত একটি চরিত্র। চরিত্রটির যে ব্যথা পূর্বে ছিল তা তার একলারই ছিল, সেই ব্যথায় যখন সবাই সাড়াও দিল ততদিনে তার ব্যথা বদলে গেছে। শেষপর্যন্ত বদলে যাওয়া সময়েও তার ব্যথা একলারই থেকে গেছে। আলোচক, গল্পটিকে সংসারের জলছবি বলেছেন। যে সংসারে মৃত্যুর জন্য স্বামী চুম্বন দেন স্ত্রীকে।

চুঁচুড়ার গল্পকার অরিন্দম গোস্বামীর গল্প 'তাসের ঘর' একটি সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত। গোলাপী বাড়িগুলোর ফাটল, সরকারি প্রতিশ্রুতি, মিতুলের পুতুল আর দিম্মার সংসার ভেঙে পড়া সবই ধরা পড়ছে, যার কারণ শহর আধুনিক হয়ে উঠছে। আলোচক, দুটি প্রজন্মর একসাথে বাড়ি ও খেলাঘর ভেঙে যাবার দৃশ্য দেখার কথা বলেছেন।

আসরের নবম গল্পকার চুঁচুড়ার রাজীব কুমার ঘোষ  'ঘোষ স্যারের গল্প' নামক একটি গল্প শুরু করেন এই বলে,'আলো মানে হাতি'। ধর্মান্ধতার শিকার যেসব মানুষ, হানাহানির সময়ে বাস্তুছাড়া বা প্রকৃতির রোষে ছিন্নমূল তাদেরই গল্পকার একই ফ্রেমে ফেলে এক রূপক চরিত্র বুনেছেন। তথ্য ও গল্প নির্মাণ এক্ষেত্রে চরিত্রের উর্দ্ধে উঠে এক নতুন ঘরানার গল্পের সূচনা করেছে তা বলাই বাহুল্য। আলোচক, গল্পটিকে, বিপন্নতার গল্প বলেছেন। আলোচক, গল্পটির চরিত্রগুলির নাম নির্বাচণের দিকে শ্রোতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

আসরের শেষ গল্প পাঠের আগে, সাহিত্যিক সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায় এই তিনটি গল্প নিয়ে আলোচনা করেন।

চন্দননগরের গল্পকার শতদ্রু মজুমদার আসরের শেষে 'এক হাজার শব্দের গল্প'  নামক একটি কৌতুকধর্মী গল্প পাঠ করেন। গল্পটির প্রধান গুণ ছিল এর উপভোগ্যতা। আলোচক মানস সরকার বলেছেন, গল্প পাঠে স্যাটায়ার ছিল ও গল্প ল্যান্ডিংএর সময় টুইস্ট ছিল।

গল্পবৈঠকের তিন বছরের পথচলার ইতিহাস ও গল্পকারদের গল্পজীবনের পরিচয় দিয়ে সাজিয়ে অনুষ্ঠানটিকে গেঁথেছিলেন সঞ্চালিকা মৌসুমী ঘোষ। এটি ছিল কলকাতার বাইরে গল্পবৈঠকের চতুর্থতম জেলা সফর এবং হুগলী জেলায় দ্বিতীয় সাহিত্য আড্ডা।
রিভিউ লিখলেন মৌসুমি ঘোষ 

শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

গল্পবৈঠক ৩২ @ ইসক্রা পত্রিকা দফতর, কলেজস্ট্রীট



আজকাল 


ল্পবৈঠকের সঙ্গে আলাপ হয় ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে। ভাবতাম কবে আমারও ডাক আসবে গল্পবৈঠকে গল্প পড়ার। এবার বৈঠক ছিল কলেজ স্ট্রীটে, ইসক্রা পত্রিকা দপ্তরে। কলেজস্ট্রীটে গল্পবৈঠক প্রথম অনুষ্ঠিত হল।  
কলেজ স্ট্রীটে সম্পাদক প্রগতি মাইতির ইসক্রা পত্রিকার দফতরে হাজির হতেই 
গন্ধ আসে তাজা তাজা নতুন বইয়ের, পুরনো কলকাতার। 
যাইহোক যখন পৌঁছলাম, দেখলাম আসন এক্কেবারে ঠাসাঠাসি করে পূর্ণ।আমার জায়গা হল দরজার বাইরে, অনেকটা আগেকার দিনের মহিলাদের চিকের আড়াল থেকে অনুষ্ঠান দেখার মত।
সঞ্চালনা করছিলেন মানস সরকার, গল্প পাঠে উপস্থিত ছিলেন, অমিতাভ দাস, আয়োজক প্রগতি মাইতি, ভজন দত্ত, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমকি রায় দত্ত, ইন্দ্রনীল বক্সী, অরূপ আচার্য, মানস সরকার, দেবশ্রী ভট্টাচার্য  এবং যাঁর উদ্যোগে গল্প বৈঠকের প্রথম সূচনা, সেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আলোচনায় ছিলেন শ্যামল ভট্টাচার্য, বুবুন চট্টোপাধ্যায় এবং তৃষ্ণা বসাক।
প্রথম গল্প পাঠ হাবড়ার অমিতাভ দাসের। এক নব দম্পতির অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বারবার ফোন আসে মেয়েটির মায়ের। স্বাভাবিক ভাবেই অসন্তুষ্ট হয় স্বামী। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সবাই সবাইকে ভালোবাসে , কারো দাবীই অন্যায্য নয় তবু অজান্তেই নিজের প্রিয়জনকে আঘাত দিয়ে ফেলে মানুষ। এই আসরে গল্পের শব্দ সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হুয়েছিল ৮০০ শব্দে। কিন্তু লেখকের এই গল্পটির মনে হয় আরো কিছু শব্দের প্রয়োজন ছিল। তাই শেষটা মনে হল হঠাৎ করেই এসে গেল। একটা সুন্দর গল্প যেন দানা বাঁধতে বাঁধতেও বাঁধল না।
এর পরেই ছিল দেবশ্রীর গল্প পাঠ। আমার গল্পটি ছিল এক পথ শিশুকে নিয়ে। এক স্কুলের সামনে একটি ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। মেয়েটির মা সেখানে কাজ করে আর মেয়েটি নীচে মাটিতে খেলা করে। যাকে দেখে তার কাছেই ছুটে গিয়ে সে বলে 'তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার' ।সবাই বিরক্ত, আসলে মেয়েটি বোঝাতে পারে না, সে পাগল নয়, ভিক্ষাও করতে চায় না। সে শুধু জানতে চায় এর পরের লাইনটা কী!
প্রগতি মাইতির গল্পের নাম কান। গল্পের নায়ক দু একবার তার পরিবারের লোকজনদের কথায় বিরক্ত হয়ে কথা না শোনার ভান করেন, তাতেই তাঁর পরিবারের লোকজনের ধারণা হয় তিনি কানে কম শুনছেন। তাঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা চলে।
বাঁকুড়া থেকে আসা ভজন দত্তর গল্প শুনে সত্যি অবাক হলাম । ওনার গল্পের শুরুটা অসাধারণ লাগল, লেখিকার লিখতে লিখতে হঠাৎই মনে পড়ল তিনি গ্যাসে ভাত চাপিয়ে এসেছেন। গিয়ে দেখলেন যথারীতি ভাত পুড়ে গেছে। এরকম ঘটনার সঙ্গে  আমরা প্রায়ই সম্মুখীন হই, অবশ্য এতে লেখক কূলের অনেক আপত্তি শোনা গেল, তাঁদেরও লেখার সময় প্রায়ই ছটা ডিম এনে দেওয়ার হুকুম শুনতে হয়। যাই হোক ফিরে আসি লেখকের গল্পে। যে ঘটনা দিয়ে তাঁর গল্প শুরু হয়েছিল , শেষ হল কিন্তু একটু অন্যভাবে। লেখিকা যেন তাঁর কল্পনার চরিত্রকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। বেশ অন্যরকম লাগল গল্পটি।

অগ্রজ লেখিকা সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পটি অত্যন্ত চেনা জানা। কিন্তু উপস্থাপনা সত্যিই অসাধারণ। দুই পুরনো বন্ধুর দেখা হয়ছে। দুজনেই বেশ বৃদ্ধ। এক বন্ধু চোখে কম দেখেন, আরেক জন কানে প্রায় কিছুই শোনেন না। যে বন্ধু চোখে দেখেন না, তিনি বন্ধুকে না চিনেও অনায়াসে আরেক বন্ধু ভেবে কথা বলে যান। আরেক জন কানে না শুনেও তার উত্তর দিয়ে যান। দুজনেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত সৈনিক। নিজেদের জীবন উজাড়  করে দিয়েছেন সন্তানের জন্য, আজ তাঁরা ক্লান্ত , একা ।
দীর্ঘদিনের একান্তর পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্য পড়লেন তাঁর গল্প। সেটি কবিতার মত সুন্দর ভাষার বুননে মাত্রা পায়। সমালোচকের ভাষায় একটু কাব্যিক ব্যাঞ্জনার ভাগ যেন বেশিই  ছিল।
বর্ধমানের  ইন্দ্রনীল বক্সির 'জড়ুল' গল্পটি বেশ ভালো লাগল, গল্পের নায়ক তার স্ত্রীকে ভালোবাসতো, কিন্তু সে বহুদিন অসুস্থ।এমন রুগ্ন স্ত্রীকে আর কোন পুরুষের ভালো লাগে। নায়কের মাঝে মাঝে খুন করে এই ধুকপুক করতে থাকা জীবন কে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়। সে আকৃষ্ট হতে থাকে আয়ার কাজ করতে আসা মেয়েটির দিকে।স্ত্রীর পিঠে থাকা জড়ুল ,যা একসময় তাকে আপ্লুত করে রাখত, তা ছেড়ে সে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে আয়ার কাজে আসা মেয়েটির উল্কির দিকে। গল্পটির চমক একেবারে শেষে, যখন প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রী তার স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে 'আমি জানি'।
হুগলীর রুমকি রায় দত্তর গল্প অভিসারিকা এক না পাওয়া প্রেমের কাহিনী। জন্ম থেকে মুক ও বধির মেয়েটির জীবনেও প্রেম এসেছিল, কিন্তু সে প্রেম স্থায়ী হতে পারেনি। তবু মেয়েটি বিরহিনী রাধার মত , সেজে গুজে এসে দাঁড়ায় শেষ ট্রেনটি যাওয়ার সময় । তার প্রতীক্ষা যদি সেই প্রেম কখনো ফিরে আসে।
চন্দননগরের মানস সরকারের গল্পটি একটু অভিনব। ভূত, ফ্যান্টাসি সব মিলিয়ে এক অন্য রূপ নিয়েছে। বাবা মা সন্তানের জন্য চিন্তা করেন, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । মাঝে মাঝে এটা একটা বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অথচ অবচেতনে চাই বাবা মা আমাদের কথা চিন্তা করুক। এই গল্প শুনতে শুনতে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। তখন পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দিচ্ছি। যথেষ্ট বড় হয়েছি বাবা ,মা দিতে যায় না। কলেজে বাবা মাকে নিয়ে যাওয়া বড্ড লজ্জার ব্যাপার। অথচ কেজানে কেন পরীক্ষা দেওয়ার সময় ভীষণ শরীর খারাপ লাগল, মাথা ঘুরছে শরীর অবশ হয়ে আসছে। কোনমতে পরীক্ষা শেষ করে ভাবছি এই অবস্থায় বাড়ি ফিরব কী করে ! ইস্ ! এই সময়ে যদি বাবা থাকত, হল থেকে বেরিয়েই দেখি সামনে বাবা। জীবনে এত অবাক কোনদিন হইনি। বলল , এখানে কাজে এসেছিলাম ভাবলাম তোকে নিয়ে ফিরি। গল্পটার সাথে সেদিনের সেই ঘটনার মিল পাই।
শেষ গল্প ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের" প্লামকেক এবং" । ভূতের গল্প। এই গল্পটিও বাবা মা ও মেয়ের। তবে গল্পটি এই জগৎ ছেড়ে অন্য জগতে পাড়ি  দিয়েছে অন্য এক জগতে। যে স্নেহ ইহ জগতে পূর্ণতা পায়নি , সেই স্নেহই যেন সদ্য করা প্লামকেকের গন্ধ মেখে মৃত্যুর পরেও ফিরে ফিরে আসে।


প্রতিটি গল্পের খুব সুন্দর বিশ্লেষনাত্মক আলোচনা করলেন বুবুন চট্ট্যোপাধ্যায়, শ্যামল ভট্টাচার্য এবং তৃষ্ণা বসাক। 

প্রগতি বাবুর আতিথেয়তা অতুলনীয়। গল্পের মাঝখানেই এল চা ও সিঙ্গারা। প্রত্যেকের হাতে প্রগতি বাবু সামান্য উপহার তুলে দিলেন। দূর দূর থেকে আসা গল্পকার দের মন তখন কানায় কানায়। 
আমার গল্পটি ফুরলো তবে নটে গাছটি মুড়লো না। আড্ডা শেষ হল আরো একটা আড্ডার পরিকল্পনার মাধ্যমে। তবে সেটা এখন গোপন থাক, সে গল্প পরে হবে।

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০১৯

গল্পবৈঠক ৩১ @ বেঙ্গল ঘরানা



আমন্ত্রণ পত্র ডিজাইনেঃ  নন্দিনী সেনগুপ্ত 

থের দিন, ৪ঠা জুলাই। ভরা আষাঢ় অথচ মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বৃষ্টি তো দূরস্থান। তবু উত্তেজনা চরমে। গল্পবৈঠক ৩১ তম পর্বের ডাক এসেছে যে! এবার দশ জন গল্পকার তৈরি তাঁদের দশটি মৌলিক গল্প নিয়ে। সকাল এগারোটা থেকে গল্প পড়ার পালা। তারপর ভুরিভোজ।

দিনটি অবশ্য আরও আগেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু রাজ্যে তখন মহা হট্টগোল। জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন, কর্মবিরতি। এই পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল যে কোনও মানুষ সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন এ আর নতুন কথা কি? খুব প্রত্যাশিত ভাবেই পিছিয়ে দেওয়া হল গল্পবৈঠকের তারিখ। রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থার জট কাটল, সমস্যা একটা সমাধানের পথ পেল... তারপর ভাবা হল, এবার হোক গল্পবৈঠক।

স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বেঙ্গল ঘরানা”তে সেদিন ছিল খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন। কিন্তু সে কাহিনি ক্রমশ। তার আগে সকাল ঠিক এগারোটাতেই ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুরের “বেঙ্গল ঘরানা”য় জড়ো একে একে গল্পকারেরা। অন্য অনেক পরিচয়ের মধ্যে থেকে তাঁদের সেদিন একমাত্র পরিচয় তাঁরা প্রত্যেকেই গল্পকার। “গল্পবৈঠক”-এর ৩১তম পর্ব। মুখ্য উদ্যোক্তা এবং কর্ণধার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেদিন গল্প নিয়ে হাজির বুবুন চট্টোপাধ্যায়, চুঁচুড়া থেকে মৌসুমী ঘোষ, চন্দননগর থেকে কাকলি দেবনাথ, নন্দিনী সেনগুপ্ত, ডাঃ সোনালী মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায়, শ্যামলী আচার্য এবং সুপ্তশ্রী সোম।

পদ্মপুকুরের ‘বেঙ্গল ঘরানা’য় স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চমৎকার আতিথ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবহে শুরু হল মৌলিক গল্পপাঠ।

এইদিনের প্রথম আমন্ত্রিত গল্পকার মৌসুমী ঘোষ। মৌসুমীর ‘ফোনের মেয়ে’ এই সময়ের এক আশ্চর্য একাকীত্বের ছবি। এক নিঃসঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কা নারী বকুল, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মাতৃহীনা মহিলাদের ‘মা’ হয়ে ওঠেন। মায়ের নাম, বয়স, ছবি, পছন্দ-অপছন্দ, তিনি কী খেতে-পরতে ভালবাসতেন, মেয়ের জন্মদিন-বিবাহবার্ষিকী বা বিশেষ কোনও দিন বিস্তারিত জানিয়ে প্রথমে বুকিং করতে হয়। আর তার বিনিময়ে ক্লায়েন্টের সুবিধা অনুযায়ী মাসের নির্দিষ্ট দিনে চাহিদা অনুযায়ী ফোন করে খোঁজ নেন ‘ফোনের মেয়ে’দের। ক্রমশ একাকীত্ব আর নিরাপত্তাহীনতায় জড়িয়ে যাওয়া এই ভার্চুয়াল সমাজে ‘ফোনের মা-মেয়ে’র সম্পর্ক বাস্তব জীবনের এক নিখুঁত ছবি। এমনটিই তো হতে চলেছে।

কাকলি দেবনাথের ‘সে এবং প্রমা’তে নোয়াখালির মিষ্টি ভাষায় এক আদরের কাকিমার জীবনের বর্ণবৈষম্যের গল্প। তাঁর গায়ের রঙ কালো, দেখতেও অসুন্দর। তাই বোধহয় অপরূপ সুন্দর ‘ধলাকাকা’র পাশে কাকীর নাম হয়ে যায় ‘পেত্নিকাকিমা’। বারে বারে সেই কাকিমার সঙ্গে কথা হয় প্রমা’র, ধলাকাকার সোনার গৌরাঙ্গের মতো চেহারার পাশে স্বর্গের সুন্দরী অপ্সরাদের দেখা হবে বলেই যেন কাকার মৃত্যুতে কাকিমা বড় নিশ্চিন্ত! লোকের বাড়িতে ঘুরে জ্ঞান সঞ্চয় করেন তিনি, ক্যান্সারের মারণছোবলের মারাত্মক যন্ত্রণার মাঝেও আনন্দ পান, ভাবেন, এইবার আবার স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এই জন্মের যন্ত্রণা কাটিয়ে আবার সেজেগুজে নতুন বৌয়ের মতো ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন বুনে চলা ‘পেত্নিকাকিমা’র গল্পে মানুষের মনের সৌন্দর্য্যের এক অপূর্ব বিশ্লেষণ।

রাকা-কুণালের সম্পর্কের মধ্যে এক কুন্দনের সেট নিয়ে জমে ওঠে সুপ্তশ্রী সোমের গল্প ‘অন্ধকারের উৎস হতে’। কুণাল কি আত্মকেন্দ্রিক? অন্য জগতে থাকে? রাকা, কুণাল আর তাদের চার বছরের ছেলে ইমনকে নিয়ে যোধপুরে বেড়াতে গিয়ে ঘনিয়ে ওঠে এই গল্পের পটভূমিকা। কুণালের বাঙ্কে রাখা ব্রিফকেস থেকে লাল জুয়েলারি বক্সে নীল ভেলেভেটে মোড়া আরও একটি কুন্দনের নেকলেসের সামনে দাঁড়িয়ে রাকা অনুভব করে অন্য কোথাও জট পাকিয়ে আছে দাম্পত্য। পরকীয়ার চেনা প্লটের আভাসেই গল্পটির পরিসমাপ্তি।



স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়



নন্দিনী সেনগুপ্তর জার্মান ভাষা থেকে অনূদিত গল্পে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় থমকে থাকে ‘রান্নাঘরের ঘড়ি’। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত আয়ু জার্মান লেখক ভল্‌ফগাং বোশার্টের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হওয়া তো সময়ের নিরিখে অবশ্যম্ভাবী ছিল। তাঁর গদ্য এবং কবিতায় মারিয়া রিলকে এবং হুইটম্যানের ছায়া, আর সেই ইঙ্গিত, প্রতীক আর রূপকের এক অসাধারণ মিশ্রণ “দ্য কিচেন ক্লক” গল্পে। অন্যতম সেরা ওয়ার-লিটারেচার এটি। যুদ্ধফেরত এক সৈনিক, রাত আড়াইটেতে তার রান্নাঘরের ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। ওই সময় কি বোমা পড়েছিল বাড়িতে? ওই সময়? যে সময়ে উলের কার্ডিগান আর লাল শাল গায়ে দিয়ে খালি পায়ে মা এসে দাঁড়াত খাবার টেবিলে, শুধু বলত রোজ, ‘আজ আবার দেরি’? পার্কের বেঞ্চে নীল-সাদা ঘড়িটা থেমে থাকে ঠিক আড়াইটেতেই। মা’কে মনে পড়ে। যুদ্ধে হারিয়ে গেছে বহুকিছু। পরিবার, সম্পর্ক। থেমে থাকা ঘড়িতে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে অপদার্থ অপ্রয়োজনীয় একটা যুদ্ধ। আহা! অনুবাদটি বড় স্বচ্ছ। বড় কাব্যিক।

রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্য হওয়ার সুবাদে সাংবাদিক স্রবন্তীর বহু অভিজ্ঞতা। তার কাছ থেকে তার মুখেই শোনা হল এক আশ্চর্য গল্প। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। এক প্রতিষ্ঠিত নারী আর তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের মধ্যে এসে দাঁড়ায় সেই পরিবারের আরেক সদস্য। ভদ্রমহিলার স্বামী। ব্যস্ত অধ্যাপিকার জীবনে অত্যাচারী অথচ অত্যন্ত সুপুরুষ স্বামীর প্রতি তাঁর ডেডলি অ্যাডিকশান— গার্হস্থ্য হিংসা এবং সাইকোপ্যাথির এক গায়ে কাঁটা দেওয়া কাহিনি। গল্প হলেও সত্যি।

শ্যামলীর ‘পাপবোধ’ গল্পটি মেয়েমানুষের মনের কোন অন্ধকার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। আপাতভাবে খুব সাদামাটা গল্পটি অরণ্যা নামে এক মেয়ের যেন মধ্যবিত্তের বাস যাত্রার ডায়েরী বলে শুরু হয়। লেখকের হাতে সেই সামান্য বাসযাত্রা অসামান্য হয়ে ওঠে তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। শ্যামলীর শব্দ বন্ধন নাড়া দেয় গল্প শুনতে শুনতে। সবশেষে অন্য একটি মেয়ের পড়ে যাওয়া পার্স টি কুড়িয়ে নিয়ে অরণ্যা ভাবতে থাকে তার মধ্যে রাখা টাকা দিয়ে নিজের অতি পছন্দের শাড়ি কিনবে কি না। অন্যদিকে সেই পার্সের মালকিন তখন বাস থেকে নেমে রাস্তায় খুঁজতে থাকে সেই পার্স। এই দু-তরফের মানসিক টানাপড়েন শ্যামলীর কলমে বাস্তবিক হয়ে উঠল। সেদিক থেকে গল্পের নাম পাপবোধ সার্থক।  

বুবুন চট্টোপাধ্যায় শোনালেন “বাসনা”। এক মুসলমান সাংবাদিকের শিকড়ের খোঁজ আবার দেশভাগের যন্ত্রণাকেই যেন মনে করিয়ে দেয়। অগাধ পড়াশোনা করা শামিম মদ্যপান ছাড়তে চায়, চাকরি চলে যাওয়ার পরে সে লিখতে চায় এক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। তার দাদু ফরিদপুর থেকে এদেশে আসেন ১৯৫৭ সালে। দাদু আসিফ আফসারের সঙ্গে জড়িয়ে যায় মাজদিয়া গ্রামের অম্বিকা দাশগুপ্তর নাম। শামিমের বাবা সমীর আফসার, মা নীলিমা আফসার কিন্তু স্ত্রী নন্দিনী হিন্দু। জাহিদুলের সঙ্গে ফরিদপুরের গ্রামে গিয়ে শামিম জানতে পারে এক নির্মম সত্য। তাদের পরিবারে লুকিয়ে থাকা এক মর্মান্তিক অপমানের কাহিনি।

সোনালী মুখোপাধ্যায়ের ‘আকাশের মতো নীল’ এক দুর্দান্ত রোম্যান্টিক রিলিফ। ক্যাব-চালক আজিজুল আর তার সদ্যবিবাহিত বিবি রেশমার দিওয়ানাপন। দেশে ফুফার মেয়ের বিয়ে। মেহেন্দির রঙ লাগছে মনে, কাঁচের চুড়ির গোছায় ‘পিয়া বিনা জিয়া তরসায়’। চাচার দেওয়া চাকরি থেকে ছুটি পাবে না আজিজুল। কোম্পানির গাড়ি চালানো ছেড়ে ছুটি পাওয়া এতই সোজা? অনন্ত ফোনে প্রেমালাপ আর মধুর বিরহের উঁকিঝুঁকি। দো টাকিয়া কি নৌকরি ছেড়ে কি আজিজুল ফিরে গেল রেশমার কাছে? মাত্র তো কয়েকদিন। আবার না হয় আজিজুল ফিরে আসবে এই ইঁট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে। ফোনে ফোনে রচিত হবে বিরহের মেঘদূত।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কুশলী কলমে ‘এক পাগলের গল্প’ যেন সমাজের এক টুকরো যন্ত্রণার নিটোল ছবি। ছেঁড়া প্যান্ট, খালি পা, মাঝবয়সী বিজয় পাল আর তার মাতৃহীন ছেলের গল্প। একমাত্র ছেলেকে তার মানুষ করতেই হবে। সেই ছোট্ট নুটুকে নিয়েই পাগল লোকটার যতরাজ্যের চিন্তা। সে কি সত্যিই পাগল? পাগলেরা কি চিন্তাশূণ্য হয়? লেখকের জবানিতে নুটু আর তার বাবার এক সামাজিক উত্তরণ হয়। একটু একটু করে খোসা ছাড়িয়ে দেখা যায়, কে কেন কবে কোথায় বঞ্চিত করেছে তাদের। অল্প কথায় এক বিরাট উপন্যাসের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে ‘এক পাগলের গল্প’তে।

কৃষ্ণা রায়ের ‘শতবর্ষ পরে’ কল্পবিজ্ঞানের এক আশ্চর্য যাত্রাপথ, স্বাধীনচেতা রিনির অস্থায়ী দাম্পত্যের পাশাপাশি ২১১৫ সালে ৭৫ বছরের জন্মদিনের প্রস্তুতি। যখন মানুষের গড় আয়ু ১৩০ থেকে ১৪০ বছর। এখন ক্লোরোজিন থেরাপিতে ক্লোরোফিলের জিন দেওয়া হচ্ছে হাত-পায়ের চামড়ায়। দিনে কয়েকঘন্টা রোদ। ব্যস। ফিকে সবুজ হাত-পা কিছুদিন। তারপর সব স্বাভাবিক। নিঃসঙ্গ সমুদ্রপাড়ে গাছ-মানুষীকে ছুঁয়ে যায় গাঢ় মধ্যরাতের আকাশ। ভিজে ভিজে অনুভূতিতে কোনও সম্পর্কের জন্য বাড়তি সময় নেই। জানালার বাইরের অন্ধকারে, হাওয়ার ঝাপটায় এক ভবিষ্যতের কাঁপন। 



 
খুদে গল্পকার শ্রীপর্ণা ঘোষের স্বরচিত গল্প পাঠ
যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক ২১শে জুলাই ২০১৯ 


দশ গল্পের শেষে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া। কাঁসার থালা-গ্লাস-বাটিতে চিংড়ি-পোলাও, মাছের পুর ভরা পটলের দোরমা, খাসির কষা মাংস, রথের পাঁপড়, কাঁচা আমের চাটনি আর সিমুইয়ের পায়েসে এক মায়াময় শিকড়ের টান। বাঙালি খাবারের আন্তরিক পরিবেশনে মনের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে নস্ট্যালজিয়া। গুণী শিল্পী অরিন্দম-স্রবন্তী যুগলে গেয়ে ওঠেন ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনের ভিতরে’। বাইরে তখনও রোদ ঝলমল। রথ বেরিয়েছে পথে। ধূলামন্দিরের পাশ দিয়েই আমাদের ঘরে ফেরার পথ।

প্রতিবেদন লিখলেন শ্যামলী আচার্য 



বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯

গল্পবৈঠক "৩০" @ ‘আড্ডা’ নিউ জার্সি র পত্রবৈঠক, উনিশে মে, ২০১৯




শুরুটা হয়েছিল নিতান্তই সাদামাটা । পূর্ণেন্দু পত্রীর ভালোলাগা কবিতা মুখপুস্তিকায় পোস্টিয়ে 'আড্ডা' লিখেছিলো - “তোমার চিঠি আজ বিকেলের চারটে নাগাদ পেলাম /দেরী হলেও জবাব দিলে সপ্তকোটি সেলাম........আসবে কি সেই রেস্টুরেন্টে শীতাংশু  যার মালিক?/রুপোলী ধান খুঁটবে বলে ছটফটাচ্ছে শালিক ।”সেখান থেকেই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া ।  সুস্মিতা রায়চৌধুরী লিখলো - 'চিঠি নিয়ে একটা বৈঠক করলে কেমন হয় ?' সঙ্গে সঙ্গে সোৎসাহে উত্তর - 'হোক, হয়ে যাক তাহলে' ।  সোনায় সোহাগা হলো কলকাতার নামী লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের এদেশে উপস্থিতি ।  ঠিক হলো পত্রসাহিত্যের ডালি নিয়েই 'আড্ডা' ইন্দিরা আর দেবজ্যোতি চ্যাটার্জীদা-র সঙ্গে বৈঠকে বসবে উনিশে মে, রবিবার বিকেলে ! উনিশে মে দিনটি বিশেষ করে স্মরণীয় কারণ এই দিন ভাষা আন্দোলনের আর এক শহীদ দিবস ।  বাংলা ভাষার অধিকারের দাবীতে এ দিন আসামের বরাক উপত্যকায় রক্ত ঝরেছিল  ।  

প্রদীপ জ্বালার আগে সলতে পাকানোর কাজ শুরু হলো পুরোদমে। পত্রবৈঠকের আয়োজন হবে আর রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ মনে পড়বে না - তাও কি হয় ? সেই যে 'চরণতলাশ্রয়ছিন্ন' মৃণাল নিজের মতো করে বাঁচার আনন্দ তার চিঠির ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে দিয়েছিলো, সেখান থেকেই তো বাংলাভাষায় প্রথম সার্থক পত্রসাহিত্যের শুরু ।  তারপর তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন বুদ্ধদেব গুহ - 'সবিনয় নিবেদন' ।    পত্রবৈঠকের আগের সপ্তাহে প্রতিদিন ‘আড্ডা’ প্রকাশ করেছে সুপরিচিত লেখক /লেখিকার পত্রসাহিত্য ।  ছিলেন শামসুর রহমান, তসলিমা নাসরিন, রাজা সিংহ এবং এমন কি সলিল চৌধুরী !

বাঙালী ভোজনরসিকও বটে, সাহিত্যরসিকও বটে ।  এহেন বাঙালির মনোরঞ্জন করার জন্য ‘আড্ডা’  এক অভিনব উপায়ে পত্রবৈঠকের খাদ্যতালিকা পেশ করে ।  সে এক রূপকথার কাহিনী যেখানে ভোজনরাজ্যে রাজকন্যা লুচির স্বয়ংবর সভায় উপস্থিত থাকেন রাজকুমার ছোলার ডাল, মহারাজ ডিম্ব, প্রেমিক মালপোয়া কুমার ।  সুরসিক পাঠক পাঠিকা তৎক্ষণাৎ লক্ষ্য করেন লুচিকুমারীর আবাল্য সহচর রাজকুমার আলুর অনুপস্থিতি ।   জয়শ্রী পাইন প্রশ্নবাণ হানেন - 'রাজকুমার আলুর কি দম ছুটিয়া গিয়াছে ? সভায় অনুপস্থিত দেখিতেছি ?' এর পরের কাহিনীটি বিরাট ।  কেবল এইটুকু বলি, জনসমর্থনের চাপে পড়ে ভোজনরাজ, রাজপুত্র আলুকে স্বয়ম্বর সভায় শেষমুহূর্তে আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন । আলু রাজকুমার একটি ধুরন্ধর কূটনীতির চালে মালপোয়া কুমারকে  ধরাশায়ী করেন ও রাজকন্যা লুচির বরমাল্য লাভ করেন ।  বিশদ বিবরণের জন্য ‘আড্ডা’র মুখপুস্তিকা দ্রষ্টব্য । 

পত্রবৈঠক বসেছিল দুপুরবেলা, সবুজ ঘাসে ছাওয়া, খোলা ব্যাকইয়ার্ডে, গাছগাছালির মাঝে, পাখির কূজনকে সঙ্গী করে ।  প্রকৃতিদেবী দুহাত ভরে  দিয়েছিলেন তাঁর আশীর্বাদ ।  রোদ্দুরে ধোয়া দিন, প্রথম গ্রীষ্মের মনোরম আবহাওয়া আর  ব্যাকড্রপে ‘আড্ডা’র ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ, ফুটবল, মাছের ছবি আর আল্পনা - বৈঠকের সব আয়োজনই সারা ।  বিদিশা মুখোপাধ্যায়ের নিটোল মিষ্টি গলায় বেজে উঠলো - 'একটা গান লিখো আমার জন্য' ।   তারপর অমায়িক দেবজ্যোতিদার হাতে মাইক, তিনি উৎসাহ যোগালেন আরো আরো লেখার জন্যে, যাতে আরো আরো এমন বৈঠকের আয়োজন করা যেতে পারে ।  

ইন্দিরার বক্তব্যে প্রথমেই ছিল উনিশে মে, এই দিনের বৈশিষ্ট্য, ভাষা শহীদ দের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধার্ঘ্য ।  ইন্দিরা বরাবরই নতুন লেখকদের পৃষ্ঠপোষক ।  আমাদের উৎসাহ দিলো ।  নতুন লেখা লিখে নিয়মিতভাবে এমন পাঠের আসর আয়োজন করার গুরুত্ব যে কতখানি - সেটা বারবার মনে করিয়ে দিলো ।  ইন্দিরার অকুন্ঠ প্রশংসায় ‘আড্ডা’র এই প্রচেষ্টা ধন্য হলো ।   চন্দ্রিমা বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ল নিজের বান্ধবীর লেখা চিঠি, সাহিত্যরসে ভরপুর ।  সম্পাদিকা অনসূয়া সেন ছোট্ট বক্তব্যে নিজের জাত চেনাল, পরিচয় করিয়ে দিল 'সংবাদ বিচিত্রা'র সঙ্গে ।  নতুন নতুন লেখা পাঠাতে অনুরোধ করল ।  আমরা উৎসাহিত হলাম, সম্মানিত হলাম ।  সুদীপ্তা চট্টোপাধ্যায় বলে ওর সব লেখারই উৎস নাকি কোন না কোন দু:খ ।   পত্রবৈঠকে পাঠ করা ওর লেখাটি মানুষের মান আর হুঁশটাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়ে গেলো । মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী এসেছিলো তিনটি ভিন্নস্বাদের চিঠি নিয়ে ।  তার একটিতে মা তার এখনো-ভূমিষ্ঠ-না-হওয়া গর্ভের সন্তানকে লেখা চিঠিতে মনের আগল খুলে দেয় ।   আরেকটি চিঠিতে থাকে দ্রুতগামী পৃথিবীকে দূর থেকে দেখা আর অনুভবের মায়া ।  এরপর ইন্দিরা ।  তার নিজের উপন্যাস কলাবতী কথা থেকে পড়ে শোনালো নতুন দেশে গিয়ে এক মেয়ের বিস্ময়ভরা চিঠি, তার মাকে লেখা ।  সে চিঠির ছত্রে ছত্রে জেগে ওঠে এক অন্ত্যজ মেয়ের চোখে দেখা এক নতুন পৃথিবী - বিস্ময়ে জাগে আমার প্রাণ ।  পদ্মাসনা বন্দ্যোপাধ্যায় এলো তার মায়ের লেখা পত্রসাহিত্যের উপহার নিয়ে ।  স্বদেশে বসে এক প্রজন্ম আগের লেখিকার কলমে সে গল্প আমাদের গতানুগতিক ফীল-গুড ভাবনাচিন্তা কে আপাদমস্তক ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায় ।  মাকে লেখা এক মেয়ের চিঠি, যে মেয়ে শুয়ে আছে মর্গের ঠান্ডা, হিমশীতল ঘরে ।  জীবন থেকে পাওয়া বঞ্চনা আর যন্ত্রণার কথা মা ছাড়া আর কাকেই বা সে বলবে ? মায়ের লেখা গল্প-চিঠি পাঠ করলো বিদেশবাসী কন্যা ।  জীবনের কোথাও এক বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো ।  

এরপর ভোজনরাজ্যে নিমন্ত্রণ রক্ষার পর্ব, যদিও সংক্ষেপে, কারণ সময় কম, সাধ অনেক ।  লুচিকুমারীর স্বয়ংবর সভায় ছিল শব্দছক, ছিল সাহিত্য নিয়ে প্রশ্নোত্তরের আসর ।  সুরসিক শুদ্ধসত্ত্ব আচার্য তার প্রশ্নবাণে শ্রোতাদের ধরাশায়ী করতে চেয়েছিল কিন্তু পেরে উঠলো না ।  শ্রোতারা যারপরনাই বুদ্ধি ধরেন ।  

পত্রবৈঠক এবার দ্বিতীয়ার্ধে, দ্বিতীয় অধিবেশনের প্রথমেই অদিতি ঘোষ দস্তিদার তার ছেলেবেলার সই বিদীপ্তার কাছে চিঠিতে মন উজাড় করলো ।  দুই সখীর মান-অভিমান, আড়ি আর ভাব, স্কুলের সেই হালকা হাওয়ায় ভাসা দিনগুলি ফিরিয়ে দিলো শ্রোতার কাছে ।  ছেলেবেলা (নাকি মেয়েবেলা?) ফিরে পেলাম আমরা ।  সাহানা ভট্টাচার্য বাজলো এক্কেবারে অন্য সুরে ।   ছোট্ট তিন মিনিটের একটি লেখা, রসে টইটম্বুর ।  বক্তব্য - বঙ্গদেশ থেকে এক জননী তাঁর চির-অবাধ্য, পাঠে অমনোযোগী, কুলকলঙ্ক, বিদেশবাসিনী জ্যেষ্ঠাকন্যাটির মুখদর্শন করবার সুতীব্র বাসনায় শেষমেশ একটি স্মার্টফোন কিনে অতীব মনোযোগে হোয়াটস্যাপ শিক্ষা করে তাঁর ষষ্ঠীব্রত উদযাপন করলেন ।   সোফিয়া মিত্রর ছোট্ট লেখা । কিন্তু তাতে সব প্রবাসীর হারিয়ে ফেলার যন্ত্রণার অভিব্যক্তি  ।   প্রবাসে উন্নত কিন্তু কৃত্রিম দুনিয়ায় নিজেকে দামী মুক্তোর গয়নায় সজ্জিত করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখ যায় ঝাপসা হয়ে  ।  মনে পড়ে যায় দূর দেশে পড়ে থাকা মা বাবার কথা, যারা শুক্তির মত সব যন্ত্রণা ভোগ করে তিলতিল করে গড়ে তুলেছে আমাদের ! সংগ্রামী লাহিড়ী তার লেখায় উনিশে মে র ইতিহাস তুলে ধরলো ।  সুস্মিতা রায়চৌধুরী তার নৃত্যানুষ্ঠান সেরে পত্রবৈঠকে পৌঁছতে পারে নি, কিন্তু তার লেখাটি সে 'আড্ডা'র ডাকবাক্সে ফেলে দিতে ভোলেনি ।  বড়ো মন-কেমন করা চিঠি, নিজেরই মনের সঙ্গে আলাপচারিতা, জীবনের ঝাঁপি উজাড় করে একাকিত্ব ভোলা - ঠিক যেন একটি বিষাদমধুর কবিতা । 

'আড্ডা'র প্রথম সাহিত্য-বৈঠককে স্মরণীয় করে রাখতে 'টিম আড্ডা' তৈরী করেছিল ম্যাগনেট ।  হাতে আঁকা 'আড্ডা'র লোগো, তার সঙ্গে বৈঠকের দিনক্ষণ - সবাই পেলেন একটি করে ।  ম্যাগনেট মনে করিয়ে দেবে খোলা হাওয়া প্রাণে লাগিয়ে সাহিত্য বাসরের সুখস্মৃতি ।  আর ইন্দিরা ও দেবজ্যোতি-দা কে  সম্মান জানিয়ে উপহার ছিল কাঠের ফলক, একইরকম হাতে আঁকা ছবি দিয়ে সাজানো ।          

শেষে আবার ইন্দিরা ।  এবার তার নিজের লেখা একটি ছোট গল্প দিয়ে শেষ হলো পত্রবৈঠক ।  কিন্তু শেষ হয়েও যে হইল না শেষ ! গোধূলি আলোয় বসলো গানের আসর, সুর ছড়িয়ে গেল সাঁঝ আকাশে, পুকুর-ভরা টলটলে জলকে আলতো ছুঁয়ে, ইথার তরঙ্গে ভেসে বিলীন হলো মহাশূন্যে ।  রয়ে গেল ভালোলাগা, রইলো 'আড্ডা'র সংকল্প - আবার হবে, আবার আসবো গল্পের ডালি নিয়ে, আবার একসাথে মিলবো সবাই বাংলাভাষাকে ভালোবেসে । 














নিউজার্সি থেকে প্রতিবেদন টিলিখেছেনঃ সংগ্রামী লাহিড়ী 

শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৯

বর্ষশেষের গল্পবৈঠক ২৯


৪২৫  বাংলা বর্ষশেষের দিনটিতে সাহিত্যিক শ্রীমতী সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিউটাউনের গৃহে তাঁর আন্তরিক আতিথ্যে জমে উঠেছিল উনত্রিশতম গল্প বৈঠকের আসর।শুরুতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরমূর্ছনায় আসরের মূল সুরটি বেঁধে দেন সুগায়িকা শ্রবন্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপর একে একে গল্প ও কবিতাপাঠে বৈঠকী মেজাজটি জমে ওঠে।

সেদিনের স্বরচিত গল্পপাঠে ছিলেন ন'জন। পূর্বা মুখোপাধ্যায়, দ্বৈতা গোস্বামী,সাবিনা ইয়াসমিন,মহুয়া মল্লিক,দীপা চ্যাটার্জী,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়,ও সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানটান গল্প ‘আফটারম্যাথ’, সাবিনা ইয়াসমিনের ‘আহারে জীবন’, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ‘ব্যাভিচারিনী’, মহুয়া মল্লিকের ‘শঙ্খলাগা’, পূর্বা মুখোপাধ্যায়ের ‘বীরত্ব’,সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জননী’,আর যশোধরা রায়চৌধুরীর ‘তরিবৎ’ যেন এই পরিবর্তিত সময়ের সমাজজীবনের নানা রূপ,নানা মুখ নিয়ে গড়ে ওঠা বিচিত্র সব সম্পর্কের রূপকথা। সেদিনের গল্পপাঠের আসরে হঠাত উপস্থিত দ্বৈতা গোস্বামীর ‘প্রবোধবাবুর বাবা’ বা দীপা চ্যাটার্জীর ‘শ্রীময়ী আদর সমীরণ’ ছিল রম্যগল্পের সার্থক পরিবেশন।

পরিবেশটি আরো সমৃদ্ধ হয় কবি সুতপা সেনগুপ্ত, কাবেরী গোস্বামী এবং বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক কবিতাপাঠে। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তাদের কবিতাপাঠ খোলা জানলার মুক্ত বাতাসের স্নিগ্ধতা বয়ে আনে।

সবমিলিয়ে এবছরের শেষ গল্পবৈঠকটি যেন আগামী বছরের নতুন কলমে নতুন কালির শুভ সংযোজন হয়ে উঠল।   

প্রতিবেদনঃঃ সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়