Sunday, March 31, 2019

গল্পবৈঠক ২৮ @ সাঁইথিয়া, বীরভূম

আনন্দবাজার পত্রিকা
০১৯ এ গল্পবৈঠকের মুকুটে আরেকটি পালক সংযোজিত হল। গত ২৩শে মার্চ বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরে শশীভূষণ দত্ত বালিকা বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হল গল্পবৈঠকের ২৮তম সাহিত্যবাসর। ২০১৬র হুগলী জেলার উত্তরপাড়ার পর এই নিয়ে দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গের কোনও জেলায় আয়োজিত হল এই গল্পপাঠের আসর। কলকাতা থেকে হাজির হয়েছিলেন গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সাঁইথিয়ার গল্পকার সুজাতা রায়ের তত্ত্বাবধানে অন্য্যন্য গল্পকারেরা ছিলেন মিলি মজুমদার, ব্রততী মন্ডল রায়, ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়, মিতালী দাস গোস্বামী, সুনেত্রা সাধু এবং সৌমী সিংহ । সমগ্র অনুষ্ঠানটি সুচারু হস্তে সঞ্চালনার দায়িত্ত্বে ছিলেন কবি, লেখক, নাট্যকার শ্রী বিজয় কুমার দাস। শনিবারের দুপুরে মধ্যাহ্নভোজের পর সুখনিদ্রায় ডুব না দিয়ে হাজির হয়েছিলেন সাঁইথিয়ার অজস্র মানুষ, যারা বাংলা ছোটগল্প শুনতে ভালোবাসেন।  
বিজয়কুমার দাস

বিজয়কুমার দাস অনুষ্ঠানের শুরুতেই বললেন সাঁইথিয়ার হারিয়ে যাওয়া ব্যাবসা বাণিজ্যের ঐতিহ্যের কথা। আর সেই লক্ষ্মীর হাত ধরেই এই অঞ্চলের মানুষ এখানে সরস্বতী বন্দনায় ব্রতী হতেন বহু যুগ আগে থেকেই। তাই সারস্বত চর্চায় বীরভূমের সাঁইথিয়া শহরের গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। গ, ল আর প নিয়ে গল্প শব্দটির তাত্পর্য ব্যখ্যা করলেন তিনি। গ এর অর্থ গল্পের গমন, ল এর অর্থ লিখন এবং প এর অর্থ হল পঠন। তাই একজন গল্পকার কিভাবে গল্পের জ্বাল বুনছেন এবং কেমন তার বিন্যাস আর সর্বোপরি পাঠক বা শ্রোতা কেমন ভাবে তা নিচ্ছেন সেটা জানা বোধহয় সবচেয়ে প্রয়োজন গল্প লিখিয়েদের। একটি পাঠযোগ্য গল্প একজন পাঠক বা শ্রোতার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেই সেই গল্প লেখার সার্থকতা। 
সৈয়দ হাসমত জালাল

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি, লেখক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ হাসমত জালাল। স্বাগত ভাষণে শ্রীমতী সুজাতা রায় অনুষ্ঠানের মূল সুরটি বেঁধে দেন এবং তাঁকে অনুসরণ করেই এক অত্যন্ত আন্তরিক এবং অনাড়ম্বর পরিবেশ রচিত হয়ে ওঠে। স্বরচিত প্রতিটি গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র নারী। সমাজের প্রত্যন্ত স্তর থেকে শুরু করে মফঃস্বল এবং শহরের আধুনিকা নারীদের মনস্তাত্বিক এবং সামাজিক ওঠাপড়া কে ঘিরে আটটি ছোটগল্পের মনোজ্ঞ আলোচনা করেন সভাপতি সৈয়দ হাসমত জালাল। বলাই বাহুল্য তাঁর এই সাবলীল আলোচনা অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ মাত্রা দেয়।কানায় কানায় উপচে পড়া শ্রেণীকক্ষে শব্দ বলতে শুধু ছিল চৈত্রের ঝরাপাতার খসখস আওয়াজ আর মাঝেমধ্যে ছিল ইতিউতি কোকিলের কুহুতান। শুধুমাত্র বাংলাভাষাকে ভালোবেসে গল্প শুনতে আসা এমন নিমগ্ন শ্রোতা যেকোনো অনুষ্ঠানের গর্ব। সাঁইথিয়াবাসীর কাছে সেই কৃতজ্ঞতার কথা জানাতে ভোলেন নি ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। 



কবি হাসমত জালাল বললেন, "আমরা যারা পুরুষ রচিত সাহিত্য নিয়ে চর্চা করে নিজেদের সাহিত্যমনস্ক করে তুলি তাদেরো বিস্মিত হতে হবে প্রত্যেক নারীর রচনা শুনলে বা পড়লে। প্রতিটি গল্পে নিম্নমধ্যবিত্ত মধ্যবিত্ত থেকে এবং উচ্চবিত্ত মেয়েদের কথা উঠে এসেছে। গ্রামীন মানুষদের কথা বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করলে একধরণের আত্মপ্রবঞ্চনা হবে বলে আমার মনে হয়। অধিকাংশ গল্পের মূল চরিত্র একজন নারী। গ্রাম্য মানুষ হয়ে তাদের যে সংবেদনশীলতা, মানবিকতা সেগুলি যেমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে তেমনি শহুরে মানুষদের চরিত্র চিত্রায়নেও সফল গল্পকারেরা। 

মিতালী দাসের চিঠির আঙ্গিকে লেখা "অর্ধেক আকাশ" গল্পটিতে শাশুড়ি বৌয়ের কথোপকথন উঠে আসে। সমাজের বহু চর্চিত বিষয়। নারী নিজের অজান্তে পুরুষতন্ত্রে বড় হতে হতে নিজেদের হাতে ক্ষমতা তুলে নেয়। সেই জেরে অমানবিক হয়ে পড়ে শাশুড়ি বীণাপাণি দেবী । হয়ে ওঠেন তাঁর সংসারের চিরন্তন ক্ষমতার কন্ঠস্বর।তিনি নিজে নারী হয়েও ভুলে যান যে তাঁর বৌমাও একজন নারী। তাকে প্রথম কন্যাসন্তান নষ্ট করতে বাধ্য করেন এবং দ্বিতীয় সন্তানটিও কন্যা হয়ে আসে আবারো। এবং সেখানেই গল্পের আসল মোচড়। এবার বৌমাটি মনে করছে এই দ্বিতীয় কন্যাটি‌ই ভবিষ্যতে শাশুড়িকে শিক্ষা দেবে এবং তার মনোস্কামনা পূর্ণ করবে। তার মানবিকতা দিয়ে হয়ত সে পূর্বনারীকে জয় করতে পারবে।     
পরের গল্পটি ব্রততী মন্ডল রায়ের "অভিশাপ" অত্যন্ত কঠিন, নির্মম বাস্তবতার কাহিনী।  দিন আনা দিন খাওয়া ঝুপড়িবাসীকে কেন্দ্র করে।
তাদের ঘরের মেয়েরা অভাবের তাড়নায় বড় হয়ে রোজগার করে আনে। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারেনা কি করে সংসারে এত টাকা আসছে। ভালোই তো মেয়ে টাকা রোজগার করে আনছে। তারা বুঝতেও পারেনা সেই মেয়েকে একদিন বিয়ের নাম করে বয়স্ক পাত্রের হাতে তুলে দেয় কেউ। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সে একদিন বিক্রী হয়ে যায়। দেহ ব্যবসায়ী হয়ে যায়। বাড়ির লোকেরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনা। বেচারা, নিরীহ মেয়েটি বুঝতেও পারেনা তার জন্য কি অপেক্ষা করে আছে। সেখানে তার দেহের ওপর অমানবিক নির্যাতন হবে, যা ছিল মেয়েটির কল্পনার অতীত। ক্লাসরুম উপচানো উপস্থিত প্রত্যেকে যে গল্প মন দিয়ে শুনেছেন সেটাই গল্পবৈঠকের পরম প্রাপ্তি। লেখক এবং শ্রোতার মধ্যে এই নিবিড় সম্পর্ক আমাকে মুগ্ধ করেছে।  আমি নিজেও খুব আশ্বস্ত বোধ করছি বাংলাসাহিত্য, বাংলাভাষায় রচিত ছোটগল্প নিয়ে।
সৌমী সিন্‌হার গল্প "পিছুটান" সেখানে প্রধান নারী চরিত্রটি যার নিজের খাবার সামর্থ্য নেই সে পরিচারিকার কাজ করে । তার কাজের বাড়িতে পোষা বেড়ালটি বাড়ি ফেরেনি তিনদিন ধরে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আজকাল বড়োই কৃত্রিম। সেখানে পোষ্য বেড়ালটির প্রতি তার মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা অপূর্বভাবে ফুটে উঠেছে। সবচেয়ে ভাল লাগে শেষের অংশে যখন বেড়াল টি ঢাকা দেওয়া খাবার খেয়ে নেয়। মেয়েটির মন ভরে ওঠে কানায় কানায়।   

মিলি মজুমদারের গল্প "আতঙ্ক" তেও ছ 'বছরে মাতৃহারা মেয়ে গঙ্গার বিয়ে হল চব্বিশ বছরে। তাঁর পুত্র সন্তান হয়নি বলে বিচ্ছেদ ঘটেছিল। সেই গঙ্গাকে ধর্ষণ করে কেউ। আর পরে যখন তাঁর পুত্র সন্তান হল দেখা গেল সবাই তাকে লক্ষ্য করতে থাকে জমিদারের পুত্রর সঙ্গে সেই পুত্রের সাদৃশ্য দেখে । খুব বাস্তব চিত্র। যুগে যুগে দেখা যায় এমন ঘটনা। সমাজের তথাকথিত নিম্ন বর্গের মানুষ বড়লোকদের কাছে অস্পৃশ্য। কিন্তু তাকে স্পর্শ করে পুরুষের কামনা চরিতার্থ করার বেলায় সে আর অছ্যুত থাকেনা। বাধা থাকেনা তাকে ছুঁতে। এমনই সমাজের পরিহাস।

 ঝিমকি বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প "করমটিলার ইতিকথা" এক প্রত্যন্ত গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে যাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করা হয়। ময়ূরাক্ষীর তীরে জঙ্গলাকীর্ণ করমটিলার হতদরিদ্র ভল্লা পরিবারে হঠাত করে আগত এক যুবতীকে সেই গ্রামের মেয়ে মরদ হাঁড়িয়ার ঘোরে তাকে দেবীজ্ঞানে পুজো করতে থাকে। মূহুর্তেই সেই যুবতীর মানবী থেকে দেবীতে উত্তরণ ঘটে।পুণ্য সঞ্চয়ের আশায় সবাই সেই দেবীকে কাজে লাগাতে চায়। দেবী রোগের উপশম করেন। বিশ্বাস জন্মায় সকলের। গোটা গ্রামে সবাই দেবীর মাহাত্ম্য অনুভব করে। সবাই জয় দেয় দেবীর নামে। দেবীর প্রতিপত্তি বাড়ে। ভক্তদের আনুগত্যে দেবীর অভাবও ঘোচে। হঠাত বর্ষার আগমনে ময়ূরাক্ষীতে বন্যার আশংকা। বাঁধ ভেঙে গ্রাম বানভাসি হবার আশংকা। তখন দেবীকে জাগানোর কথা মাথায় আসে। তিনি‌ই সেই মূহুর্তে একমাত্র ভরসা তাদের। রাতের বেলায় সবাই যখন ঘরে ফিরে যায় সেই গ্রামের শক্তপোক্ত বীরপুরুষ ধুঁধুল সবাইকে জেগে বাঁধ পাহারা দেবার কথা বলে। শীতলা জ্ঞানে পূজিতা সেই দেবীর থানে কাঠি, তেলের কুপি জ্বালিয়ে হাজির হয় ধুঁধুল। কিন্তু দেবীর রূপ দেখে নিজেকে সামলাতে পারেনা সে। ঝাঁপিয়ে পড়ে সে মানবী শীতলাদেবীর ওপর। নিজের বিচারবুদ্ধি লোপ পায় তার। দেহরসের টানাপোড়েনে জর্জরিত ধুঁধুল সব ভুলে যায়। ওদিকে নদীর জল নেমে প্রকৃতি শান্ত হয়। খরিস সাপে কাটে ধুঁধুলের ছেলেকে। তার বৌ রাইমণি ছেলেকে নিয়ে ছুটে যেতে চায় মায়ের থানে। বাধা দেয় ধুঁধুল। বলে ও দেবী নয়, মানবী। ততক্ষণে ছেলে সাপের বিষে মারা যায়। রাইমণি দোষারোপ করে স্বামীকে। দেবীর রোষেই সে পুত্রহারা হয়েছে সে জানায়। এভাবেই একদিকে কুসংস্কার অন্যদিকে নারীকে ব্যাবহার করে তাকে কাজে লাগিয়ে গ্রাম্যজীবনের টানাপোড়েন পর্বের সমাধা হয়।  

সুনেত্রা সাধুর গল্প "বারোতলার বারান্দা"। সেখানে কেন্দ্রীয় চরিত্র দিতির সংসার অরণির সঙ্গে। বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ নয় তারা। তার মনখারাপের বারান্দা বারোতলার ওপরে বসে সে শীত, গ্রীষ্ম বর্ষা অনুভব করে। কোথাও যেন ফাঁক তার জীবনে। স্নানঘরে ঢুকে সে কেঁদে ভাসায়। এ জীবন তাকে বিষণ্ণ করে। কেন এমন হয় তার?  চলে যেতে হবে তাকে এই বারোতলা থেকে। অরণি আর আগের মত ভালোবাসেনা তাকে, সেটাই কেবলি ভাবায় দিতি কে।  কিন্তু বারান্দায় লাগানো গাছগুলোর প্রতি মায়া। জল দেবার কথা বলে যেতে হবে অরণি কে। কি অপূর্ব এক মমত্ববোধ আর আকর্ষণ এই যাবার বেলায়। পিছু ডাকে দুজনের হাতে কেনা উইন্ডচাইমের মৃদু শব্দ। আধুনিক জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেছে লিভ-ইন সম্পর্ক। দিতি আর অরণিও তার স্বীকার। তবুও যদি প্রকৃত বন্ধন হত। তাই সে চলে যেতে চায়। মনের টান নেই আর।  আর তারপরেই  দিতির জন্মদিনের সারপ্রাইজ পার্টি অর্গানাইজ করে অরণি। এলাহী আয়োজন অথচ সবটাই অজানা ছিল। সব আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রিত করেছে অরণী সেই জন্মদিনের পার্টিতে। কিন্তু সবটাই দিতির অজান্তে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে দুটি সম্পর্কে জোড়া লেগে যায়। দিতি মুগ্ধ হয় অরণির ভালোবাসায়। আর গল্পের মধ্যে এই পজিটিভ বার্তা এখনকার ভেঙে যাওয়া বহু বিচ্ছেদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে" এভাবেও ফিরে আসা যায়" 

সুজাতা রায়ের গল্প "আমরা ওরা" একজন শহুরে এবং একজন গ্রাম্য নারীকে কেন্দ্র করে। শহুরে এক মহিলার বাড়িতে পুরোণো পরিচারিকা বিজুরী হাজরার মেয়ে বকুলমণি তার সংসার সামলাত । গৃহকর্ত্রীর আদরের বিদুষী কন্যারত্ন তুতু বিদেশে চাকরীরতা। বকুলকে ছোট থেকে পড়ানোর চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রথম প্রথম সমাজসেবী হয়ে উঠছেন ভেবে শুরু করেও ছেড়ে দিলেন অচিরেই। এবং ছোটঘরের মেয়েটির যেন পড়াশুনো না শিখলেও চলবে সেইরকম মনোভাব। নিজের মেয়ের সঙ্গে বড় করতে গেলেন কিন্তু কোথাও যেন কাজ করল তাঁর আত্মম্ভরিতা। সেই বকুলের ভরভরন্ত যৌবনে বিয়ে হল একদিন। সে চলে গেল শ্বশুরঘরে। তুতু বিদেশ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠালো তার বিয়েতে। ক্রেডিট নিলেন সেই কর্ত্রী। যেন তাঁর মেয়ের দয়াতেই আজ বিয়েতে এত ঘটা হল বুঝি। একদিন নিজে যখন হাজির হলেন বকুলের নতুন সংসার দেখতে সেখানে গিয়ে অবাক তিনি। তাঁদের ধনী পরিবারের সব অনুষঙ্গ অণুকরণ করেছে বকুল। আবারো রীতিমত ঈর্ষাণ্বিত হলেন। মনে হল যা হবার নয় তাই হয়েছে। তাঁর মেয়ে তুতুর পাঠানো মহার্ঘ্য ডলারে সুখে স্বচ্ছন্দ্যে ঘরকন্না করছে পরিচারিকার মেয়ে এহেন বকুল? সুখী গৃহকোণে লক্ষ্মীশ্রী যেন উথলে উঠছে। কি পরিপাটি তার সংসারে। অথচ তাঁর মেয়ে তুতুকে কিছুতেই রাজী করানো গেল না বিয়েতে।  আর সেখানেই গল্পকার হিসেবে সার্থক সুজাতা। ট্যিপিকাল একজন মহিলার অন্য আরেকজনের প্রতি ঈর্ষাণ্বিত হবার ঘটনা, যা আমাদের অতি পরিচিত। অথচ এই বকুল কর্ত্রীর দুর্দিনে বুক দিয়ে আগলেছে তাঁর সংসার। কিন্তু মেয়েদের ঈর্ষা, হিংসার কাছে বিচারের সব বাণী অচিরেই ভেসে যায়। তার বাড়িতে গৃহকর্ত্রীর আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি রাখেনি। তবুও তাকে হঠাত খারাপ লাগতে শুরু করল সেই গৃহকর্ত্রীর। নারীমনের চোরাকুঠুরি থেকে বুদবুদ কেটে বেরিয়ে আসে শুধুই হিংসে।মনে পড়ে যায় সেই টুনটুনির গল্পের হিংসুটে রাজার কথা। রাজার ঘরে যে ধন আছে তা পাখীর ঘরে থাকাটা অবাস্তব। বকুলের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। আর গল্পটি সেখানে শেষ হয়েও শেষ হয় না।    

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্প "প্রেমপিল" একটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প। কিন্তু গল্পের শেষে আমরা আবিষ্কার করি নারী পুরুষের জোরা লেগে যাওয়া বিবাহিত সম্পর্কটিকে।
"বাস্তাবিক ভাবে একটি সার্থক গল্প" বললেন আলোচক সৈয়দ হাসমত জালাল। "মেয়েরা কল্পবিজ্ঞান সেভাবে লেখেনা। কিন্তু সেখানে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন ইন্দিরা। গল্পের নামটিও চমৎকার। দৈনন্দিন জীবনে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে চরম উদাসীন্য সৃষ্টি হয়েছিল সেটার পরিসমাপ্তি ঘটে গল্পের শেষে।শুক্তির বিজ্ঞানী স্বামী অনিমেষ দুধরনের প্রেমের বড়ি আবিষ্কারে মগ্ন। একটি ওষুধে বহুদিনের অধরা প্রেম পুনরুজ্জিবীত হবে আর অন্যটি হল প্রেম রোধক। অর্থাৎ প্রেমের বাড়াবাড়িকে রুখে দেবে। আর অনিমেষের স্ত্রী শুক্তির প্রতি সন্দেহভাজনতা তার ছাত্র প্রিয়মকে জড়িয়ে। তাই বুঝি সেই প্রেমের নিষ্পত্তি করতেই উঠে পড়ে লেগেছিলেন বিজ্ঞানী অনিমেষ। কিন্তু বুদ্ধিমতী শুক্তি ধরে ফেলেছিলেন যে তিনি‌ই হচ্ছেন তাঁর স্বামীর গিনিপিগ অর্থাত তাঁর ওপরেই পরীক্ষা চালাবেন অনিমেষ। কিন্তু শেষে শুক্তি জানিয়ে দিলেন যে প্রিয়মের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কেবলি তাঁর এক ছাত্রীকে ঘিরে যার সঙ্গে প্রিয়মের হার্টব্রেক হয়েছে। অতএব সেই প্রেম কে জোড়া লাগানোর প্রেমপিল কি অনিমেষ তাকে দিতে পারে? সেখানেই গল্পের ইতি আর অনিমেষ-শুক্তির ভাঙা সম্পর্ককে জোড়া লাগানোর পজিটিভ ইঙ্গিত"  



সংবাদ প্রতিদিন

যুগশঙ্খ, রবিবারের বৈঠক 


প্রতিবেদন লিখলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়

Monday, March 25, 2019

বসন্তে গল্পবৈঠক - মদনমোহন মন্দির, বেলঘরিয়া

সন্তে গল্পবৈঠকের আসর বসেছিল বেলঘরিয়ার মদনমোহন মন্দিরে। এটি ছিল গল্পবৈঠকের ২৭ তম আসর। প্যারীচাঁদ মিত্রর ঐতিহ্যমণ্ডিত ঠাকুরবাড়িতে মনোরম এক বসন্ত সন্ধ্যায় ১০ই মার্চ নবীনা ও প্রবীণা নজন লেখকের স্বরচিত গল্পপাঠ অনুষ্ঠিত হল। গল্পগুলির নির্দিষ্ট একটি সূত্র ছিল। সংস্কৃত নাটকে যে নয়টি রসের উল্লেখ আছে, নটি গল্প সেই নবরসের উপর আধারিত। সঞ্চালকের ভূমিকায় ছিলেন ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় । তাঁর সঞ্চালনার বিশেষ দিকটি হচ্ছে তিনি অপূর্ব সুকণ্ঠের অধিকারিনী। গল্পের মাঝে মাঝে তিনি রবীন্দ্রগান পরিবেশন করে অদ্ভুত আবহের সৃষ্টি করেছেন। গল্পবৈঠকের কর্ণধার এবং অনুষ্ঠান পরিচালনায় ছিলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান সার্থক হওয়ার পেছনে তাঁর সুচারু ভুমিকা নজরে পড়ে।
ওপর থেকে - অনিন্দিতা মণ্ডল, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, বুবুন চট্টোপাধ্যায় , সুবর্ণা রায়, নন্দিনী সেনগুপ্ত, আইভি চট্টোপাধ্যায়, পৃথা কুণ্ডু, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায় 

     শ্রীকল্যাণ নামের গল্পটি ছিল লেখক আইভি চট্টোপাধ্যায়ের । শান্ত রসের গল্প এটি। উত্তাল এবং বিধ্বংসী সম্পর্কের শেষে অভিষেকের অদ্ভুত এক উপলব্ধির জগতে প্রবেশ। পার্থিব মায়ার জগত ছেড়ে এক শান্ত নিস্তরঙ্গ মহাসমুদ্রে প্রবেশ করেছে তার মন। গল্পের শেষে মন আপনিই শান্ত হয়ে যায়। 
সুবর্ণা রায় পরিবেশন করলেন গোলাপি ক্ষত। রৌদ্র রসের গল্প। রাগের বহিঃপ্রকাশ নয়। স্বপ্নে ইচ্ছেপুরণের গল্প এক অত্যাচারিত মেয়ের। রোজ যে স্বামীর হাতে মার খায়। 
পৃথা কুণ্ডুর গল্প অজ্ঞাতবাস। বীররসের গল্প। এ গল্প শুনলে আমাদের চিত্রাঙ্গদাকে মনে পড়তে বাধ্য। 
ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় , গায়ক, সঞ্চালক, পরিকল্পক  

ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় গানও গেয়েছেন চিত্রাঙ্গদা থেকেই। এই গল্পের অধিকারী মহাশয় ও বিপ্লবী পার্থকে মনে থাকবে বহুদিন। নন্দিনী সেনগুপ্ত লিখেছেন বীভৎস রসের গল্প, সীমান্ত ক্ষত। দূর বিদেশে দুটি মানুষের সম্পর্কের মধ্যে ঢুকে পড়ে সীমান্তের কাঁটাতার। যেখানে ব্যক্তিমানুষের সম্পর্ককে দুষিত করে তোলে যুদ্ধ ও ঘৃণার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। 
নিবেদিতা ঘোষ মার্জিতের গল্প উদ্ভট। অদ্ভুত রসের গল্প। সাহিত্যের অঙ্গনে প্রতিভাবান অথচ নবীনদের হেনস্থার একটি অপূর্ব শ্লেষাত্মক রচনা লিখেছেন নিবেদিতা। কিন্তু ক্রমশ চেপ্টে যাওয়া মানুষও যে ইচ্ছেপূরণের জন্য নিজের ভাবনা অনুযায়ী পাল্টে যেতে পারে তার প্রমাণ অন্তু। শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছেতে সে হয়ে যায় একটা ট্রাক, যার পিঠে হলুদ আলোর টুনি। লেখা আছে দেখবি আর জ্বলবি, লুচির মতো ফুলবি। সত্যিই অন্তু চরিত্রটির  বন্ধু সাহিত্যিকদের বিদ্বেষের উত্তরে। তার ট্রাক হয়ে ওঠা ছাড়া আর কিছু ছিলনা ! কৃষ্ণা রায় লিখেছেন নিশি স্পর্শ। ভয়ানক রস। এ গল্পটি শুনে শিউরে উঠতে হয়। সম্পত্তির জন্য বাবাকে চাপ দিতে থাকা, অসুস্থতাকে বাড়িয়ে দেওয়া, এ পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে কোমায় আচ্ছন্ন বাবার শরীর থেকে মাপ মতন মাংস তুলে আনা, এক লহমায় আমাদের নরখাদক বানিয়ে দেয়। সত্যিই ভয়ানক। বুবুন চট্টোপাধ্যায়ের গল্প ‘মৃত্যু’। করুণ রসের গল্প। আত্মজার আত্মহনন। এক আপাত নির্লিপ্ত পিতার মেট্রোয় আরেকটি সুইসাইড শুনে প্রথমে বিরক্তি, ‘কেন যে এরা মেট্রোকেই বেছে নেয়?’ থেকে শেষে অশ্লীল খসখসে গলার ফোনে জানতে পারা, মৃত্যু হয়েছে মেয়ের। বন্ধুদের সঙ্গে পাবে যাওয়ার অনুমতি না পেয়ে অভিমানে সে সুইসাইড করেছে। সত্যিই করুণ! কি অদ্ভুত অন্তঃসারশূন্য সমাজ তৈরি করেছি আমরা! 
গল্পটি অবশ্য আকস্মিক পাওয়া সংবাদে পিতার স্তব্ধ হয়ে যাবার কথা বলে। 

শৃঙ্গার রসের গল্প লিখেছেন অনিন্দিতা মণ্ডল। তাঁর গল্পের নাম হিয়ার মাঝে। এক যৌবন অতিক্রান্ত অধাপিকার প্রথম প্রেমের খোঁজে ছুটে বেড়ানোর গল্প। ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের রেশে গেয়েছেন ‘আমি তোমার প্রেমে হবো সবার কলঙ্কভাগী’। মন ভেসে যায় সে গানে। 
হাস্য রসের গল্পে পটু ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। তাঁর গল্পের নাম ফেসবুকেন সংস্থিতা।এই ভার্চুয়াল জগত নিয়ে কি অপরিসীম আগ্রহ আমাদের! জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে ফেসবুক। ফেসবুকের আড়ালে কল্পিত এক দেবীর পুজো নিয়ে গল্পের অন্তর্বর্তী শ্লেষ ধরা পড়ে। 
গায়িকা ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায় এ গল্পের অনুষঙ্গে গেয়েছেন সুউপযুক্ত গান ‘ও ভাই কানাই’। অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে বিদ্যাপতির ‘মাধব বহুত মিনতি করি তোয়’ পদটি দিয়ে। এ পদের সুর দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মদনমোহন মন্দিরে এমন নিবেদনের পদ গেয়ে ইন্দিরা উপস্থিত সকলকে আবিষ্ট করেছেন। এভাবেই এই পর্বের বসন্তের গল্পবৈঠক রূপে রসে উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল।          
     
প্রতিবেদন লিখলেন অনিন্দিতা মণ্ডল