Thursday, July 11, 2019

গল্পবৈঠক ৩১ @ বেঙ্গল ঘরানা



আমন্ত্রণ পত্র ডিজাইনেঃ  নন্দিনী সেনগুপ্ত 

থের দিন, ৪ঠা জুলাই। ভরা আষাঢ় অথচ মেঘের ছিটেফোঁটা নেই। বৃষ্টি তো দূরস্থান। তবু উত্তেজনা চরমে। গল্পবৈঠক ৩১ তম পর্বের ডাক এসেছে যে! এবার দশ জন গল্পকার তৈরি তাঁদের দশটি মৌলিক গল্প নিয়ে। সকাল এগারোটা থেকে গল্প পড়ার পালা। তারপর ভুরিভোজ।

দিনটি অবশ্য আরও আগেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু রাজ্যে তখন মহা হট্টগোল। জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন, কর্মবিরতি। এই পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল যে কোনও মানুষ সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন এ আর নতুন কথা কি? খুব প্রত্যাশিত ভাবেই পিছিয়ে দেওয়া হল গল্পবৈঠকের তারিখ। রাজ্যের চিকিৎসাব্যবস্থার জট কাটল, সমস্যা একটা সমাধানের পথ পেল... তারপর ভাবা হল, এবার হোক গল্পবৈঠক।

স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের “বেঙ্গল ঘরানা”তে সেদিন ছিল খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন। কিন্তু সে কাহিনি ক্রমশ। তার আগে সকাল ঠিক এগারোটাতেই ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুরের “বেঙ্গল ঘরানা”য় জড়ো একে একে গল্পকারেরা। অন্য অনেক পরিচয়ের মধ্যে থেকে তাঁদের সেদিন একমাত্র পরিচয় তাঁরা প্রত্যেকেই গল্পকার। “গল্পবৈঠক”-এর ৩১তম পর্ব। মুখ্য উদ্যোক্তা এবং কর্ণধার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে সেদিন গল্প নিয়ে হাজির বুবুন চট্টোপাধ্যায়, চুঁচুড়া থেকে মৌসুমী ঘোষ, চন্দননগর থেকে কাকলি দেবনাথ, নন্দিনী সেনগুপ্ত, ডাঃ সোনালী মুখোপাধ্যায়, কৃষ্ণা রায়, শ্যামলী আচার্য এবং সুপ্তশ্রী সোম।

পদ্মপুকুরের ‘বেঙ্গল ঘরানা’য় স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়ের চমৎকার আতিথ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের আবহে শুরু হল মৌলিক গল্পপাঠ।

এইদিনের প্রথম আমন্ত্রিত গল্পকার মৌসুমী ঘোষ। মৌসুমীর ‘ফোনের মেয়ে’ এই সময়ের এক আশ্চর্য একাকীত্বের ছবি। এক নিঃসঙ্গ প্রাপ্তবয়স্কা নারী বকুল, পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মাতৃহীনা মহিলাদের ‘মা’ হয়ে ওঠেন। মায়ের নাম, বয়স, ছবি, পছন্দ-অপছন্দ, তিনি কী খেতে-পরতে ভালবাসতেন, মেয়ের জন্মদিন-বিবাহবার্ষিকী বা বিশেষ কোনও দিন বিস্তারিত জানিয়ে প্রথমে বুকিং করতে হয়। আর তার বিনিময়ে ক্লায়েন্টের সুবিধা অনুযায়ী মাসের নির্দিষ্ট দিনে চাহিদা অনুযায়ী ফোন করে খোঁজ নেন ‘ফোনের মেয়ে’দের। ক্রমশ একাকীত্ব আর নিরাপত্তাহীনতায় জড়িয়ে যাওয়া এই ভার্চুয়াল সমাজে ‘ফোনের মা-মেয়ে’র সম্পর্ক বাস্তব জীবনের এক নিখুঁত ছবি। এমনটিই তো হতে চলেছে।

কাকলি দেবনাথের ‘সে এবং প্রমা’তে নোয়াখালির মিষ্টি ভাষায় এক আদরের কাকিমার জীবনের বর্ণবৈষম্যের গল্প। তাঁর গায়ের রঙ কালো, দেখতেও অসুন্দর। তাই বোধহয় অপরূপ সুন্দর ‘ধলাকাকা’র পাশে কাকীর নাম হয়ে যায় ‘পেত্নিকাকিমা’। বারে বারে সেই কাকিমার সঙ্গে কথা হয় প্রমা’র, ধলাকাকার সোনার গৌরাঙ্গের মতো চেহারার পাশে স্বর্গের সুন্দরী অপ্সরাদের দেখা হবে বলেই যেন কাকার মৃত্যুতে কাকিমা বড় নিশ্চিন্ত! লোকের বাড়িতে ঘুরে জ্ঞান সঞ্চয় করেন তিনি, ক্যান্সারের মারণছোবলের মারাত্মক যন্ত্রণার মাঝেও আনন্দ পান, ভাবেন, এইবার আবার স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। এই জন্মের যন্ত্রণা কাটিয়ে আবার সেজেগুজে নতুন বৌয়ের মতো ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন বুনে চলা ‘পেত্নিকাকিমা’র গল্পে মানুষের মনের সৌন্দর্য্যের এক অপূর্ব বিশ্লেষণ।

রাকা-কুণালের সম্পর্কের মধ্যে এক কুন্দনের সেট নিয়ে জমে ওঠে সুপ্তশ্রী সোমের গল্প ‘অন্ধকারের উৎস হতে’। কুণাল কি আত্মকেন্দ্রিক? অন্য জগতে থাকে? রাকা, কুণাল আর তাদের চার বছরের ছেলে ইমনকে নিয়ে যোধপুরে বেড়াতে গিয়ে ঘনিয়ে ওঠে এই গল্পের পটভূমিকা। কুণালের বাঙ্কে রাখা ব্রিফকেস থেকে লাল জুয়েলারি বক্সে নীল ভেলেভেটে মোড়া আরও একটি কুন্দনের নেকলেসের সামনে দাঁড়িয়ে রাকা অনুভব করে অন্য কোথাও জট পাকিয়ে আছে দাম্পত্য। পরকীয়ার চেনা প্লটের আভাসেই গল্পটির পরিসমাপ্তি।



স্রবন্তী বসু বন্দ্যোপাধ্যায়



নন্দিনী সেনগুপ্তর জার্মান ভাষা থেকে অনূদিত গল্পে যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় থমকে থাকে ‘রান্নাঘরের ঘড়ি’। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত আয়ু জার্মান লেখক ভল্‌ফগাং বোশার্টের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হওয়া তো সময়ের নিরিখে অবশ্যম্ভাবী ছিল। তাঁর গদ্য এবং কবিতায় মারিয়া রিলকে এবং হুইটম্যানের ছায়া, আর সেই ইঙ্গিত, প্রতীক আর রূপকের এক অসাধারণ মিশ্রণ “দ্য কিচেন ক্লক” গল্পে। অন্যতম সেরা ওয়ার-লিটারেচার এটি। যুদ্ধফেরত এক সৈনিক, রাত আড়াইটেতে তার রান্নাঘরের ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। ওই সময় কি বোমা পড়েছিল বাড়িতে? ওই সময়? যে সময়ে উলের কার্ডিগান আর লাল শাল গায়ে দিয়ে খালি পায়ে মা এসে দাঁড়াত খাবার টেবিলে, শুধু বলত রোজ, ‘আজ আবার দেরি’? পার্কের বেঞ্চে নীল-সাদা ঘড়িটা থেমে থাকে ঠিক আড়াইটেতেই। মা’কে মনে পড়ে। যুদ্ধে হারিয়ে গেছে বহুকিছু। পরিবার, সম্পর্ক। থেমে থাকা ঘড়িতে চুপ করে ঘাপটি মেরে বসে থাকে অপদার্থ অপ্রয়োজনীয় একটা যুদ্ধ। আহা! অনুবাদটি বড় স্বচ্ছ। বড় কাব্যিক।

রাজ্য মহিলা কমিশনের সদস্য হওয়ার সুবাদে সাংবাদিক স্রবন্তীর বহু অভিজ্ঞতা। তার কাছ থেকে তার মুখেই শোনা হল এক আশ্চর্য গল্প। ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন। এক প্রতিষ্ঠিত নারী আর তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের মধ্যে এসে দাঁড়ায় সেই পরিবারের আরেক সদস্য। ভদ্রমহিলার স্বামী। ব্যস্ত অধ্যাপিকার জীবনে অত্যাচারী অথচ অত্যন্ত সুপুরুষ স্বামীর প্রতি তাঁর ডেডলি অ্যাডিকশান— গার্হস্থ্য হিংসা এবং সাইকোপ্যাথির এক গায়ে কাঁটা দেওয়া কাহিনি। গল্প হলেও সত্যি।

শ্যামলীর ‘পাপবোধ’ গল্পটি মেয়েমানুষের মনের কোন অন্ধকার দিকে আঙুল তুলে দেখায়। আপাতভাবে খুব সাদামাটা গল্পটি অরণ্যা নামে এক মেয়ের যেন মধ্যবিত্তের বাস যাত্রার ডায়েরী বলে শুরু হয়। লেখকের হাতে সেই সামান্য বাসযাত্রা অসামান্য হয়ে ওঠে তাঁর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে। শ্যামলীর শব্দ বন্ধন নাড়া দেয় গল্প শুনতে শুনতে। সবশেষে অন্য একটি মেয়ের পড়ে যাওয়া পার্স টি কুড়িয়ে নিয়ে অরণ্যা ভাবতে থাকে তার মধ্যে রাখা টাকা দিয়ে নিজের অতি পছন্দের শাড়ি কিনবে কি না। অন্যদিকে সেই পার্সের মালকিন তখন বাস থেকে নেমে রাস্তায় খুঁজতে থাকে সেই পার্স। এই দু-তরফের মানসিক টানাপড়েন শ্যামলীর কলমে বাস্তবিক হয়ে উঠল। সেদিক থেকে গল্পের নাম পাপবোধ সার্থক।  

বুবুন চট্টোপাধ্যায় শোনালেন “বাসনা”। এক মুসলমান সাংবাদিকের শিকড়ের খোঁজ আবার দেশভাগের যন্ত্রণাকেই যেন মনে করিয়ে দেয়। অগাধ পড়াশোনা করা শামিম মদ্যপান ছাড়তে চায়, চাকরি চলে যাওয়ার পরে সে লিখতে চায় এক আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। তার দাদু ফরিদপুর থেকে এদেশে আসেন ১৯৫৭ সালে। দাদু আসিফ আফসারের সঙ্গে জড়িয়ে যায় মাজদিয়া গ্রামের অম্বিকা দাশগুপ্তর নাম। শামিমের বাবা সমীর আফসার, মা নীলিমা আফসার কিন্তু স্ত্রী নন্দিনী হিন্দু। জাহিদুলের সঙ্গে ফরিদপুরের গ্রামে গিয়ে শামিম জানতে পারে এক নির্মম সত্য। তাদের পরিবারে লুকিয়ে থাকা এক মর্মান্তিক অপমানের কাহিনি।

সোনালী মুখোপাধ্যায়ের ‘আকাশের মতো নীল’ এক দুর্দান্ত রোম্যান্টিক রিলিফ। ক্যাব-চালক আজিজুল আর তার সদ্যবিবাহিত বিবি রেশমার দিওয়ানাপন। দেশে ফুফার মেয়ের বিয়ে। মেহেন্দির রঙ লাগছে মনে, কাঁচের চুড়ির গোছায় ‘পিয়া বিনা জিয়া তরসায়’। চাচার দেওয়া চাকরি থেকে ছুটি পাবে না আজিজুল। কোম্পানির গাড়ি চালানো ছেড়ে ছুটি পাওয়া এতই সোজা? অনন্ত ফোনে প্রেমালাপ আর মধুর বিরহের উঁকিঝুঁকি। দো টাকিয়া কি নৌকরি ছেড়ে কি আজিজুল ফিরে গেল রেশমার কাছে? মাত্র তো কয়েকদিন। আবার না হয় আজিজুল ফিরে আসবে এই ইঁট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে। ফোনে ফোনে রচিত হবে বিরহের মেঘদূত।

ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের কুশলী কলমে ‘এক পাগলের গল্প’ যেন সমাজের এক টুকরো যন্ত্রণার নিটোল ছবি। ছেঁড়া প্যান্ট, খালি পা, মাঝবয়সী বিজয় পাল আর তার মাতৃহীন ছেলের গল্প। একমাত্র ছেলেকে তার মানুষ করতেই হবে। সেই ছোট্ট নুটুকে নিয়েই পাগল লোকটার যতরাজ্যের চিন্তা। সে কি সত্যিই পাগল? পাগলেরা কি চিন্তাশূণ্য হয়? লেখকের জবানিতে নুটু আর তার বাবার এক সামাজিক উত্তরণ হয়। একটু একটু করে খোসা ছাড়িয়ে দেখা যায়, কে কেন কবে কোথায় বঞ্চিত করেছে তাদের। অল্প কথায় এক বিরাট উপন্যাসের সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে ‘এক পাগলের গল্প’তে।

কৃষ্ণা রায়ের ‘শতবর্ষ পরে’ কল্পবিজ্ঞানের এক আশ্চর্য যাত্রাপথ, স্বাধীনচেতা রিনির অস্থায়ী দাম্পত্যের পাশাপাশি ২১১৫ সালে ৭৫ বছরের জন্মদিনের প্রস্তুতি। যখন মানুষের গড় আয়ু ১৩০ থেকে ১৪০ বছর। এখন ক্লোরোজিন থেরাপিতে ক্লোরোফিলের জিন দেওয়া হচ্ছে হাত-পায়ের চামড়ায়। দিনে কয়েকঘন্টা রোদ। ব্যস। ফিকে সবুজ হাত-পা কিছুদিন। তারপর সব স্বাভাবিক। নিঃসঙ্গ সমুদ্রপাড়ে গাছ-মানুষীকে ছুঁয়ে যায় গাঢ় মধ্যরাতের আকাশ। ভিজে ভিজে অনুভূতিতে কোনও সম্পর্কের জন্য বাড়তি সময় নেই। জানালার বাইরের অন্ধকারে, হাওয়ার ঝাপটায় এক ভবিষ্যতের কাঁপন। 



 
খুদে গল্পকার শ্রীপর্ণা ঘোষের স্বরচিত গল্প পাঠ
যুগশঙ্খ রবিবারের বৈঠক ২১শে জুলাই ২০১৯ 


দশ গল্পের শেষে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া। কাঁসার থালা-গ্লাস-বাটিতে চিংড়ি-পোলাও, মাছের পুর ভরা পটলের দোরমা, খাসির কষা মাংস, রথের পাঁপড়, কাঁচা আমের চাটনি আর সিমুইয়ের পায়েসে এক মায়াময় শিকড়ের টান। বাঙালি খাবারের আন্তরিক পরিবেশনে মনের মধ্যে জাঁকিয়ে বসে নস্ট্যালজিয়া। গুণী শিল্পী অরিন্দম-স্রবন্তী যুগলে গেয়ে ওঠেন ‘খেলাঘর বাঁধতে লেগেছি আমার মনের ভিতরে’। বাইরে তখনও রোদ ঝলমল। রথ বেরিয়েছে পথে। ধূলামন্দিরের পাশ দিয়েই আমাদের ঘরে ফেরার পথ।

প্রতিবেদন লিখলেন শ্যামলী আচার্য 



1 comment: