শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

গল্পবৈঠক ৩২ @ ইসক্রা পত্রিকা দফতর, কলেজস্ট্রীট



আজকাল 


ল্পবৈঠকের সঙ্গে আলাপ হয় ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে। ভাবতাম কবে আমারও ডাক আসবে গল্পবৈঠকে গল্প পড়ার। এবার বৈঠক ছিল কলেজ স্ট্রীটে, ইসক্রা পত্রিকা দপ্তরে। কলেজস্ট্রীটে গল্পবৈঠক প্রথম অনুষ্ঠিত হল।  
কলেজ স্ট্রীটে সম্পাদক প্রগতি মাইতির ইসক্রা পত্রিকার দফতরে হাজির হতেই 
গন্ধ আসে তাজা তাজা নতুন বইয়ের, পুরনো কলকাতার। 
যাইহোক যখন পৌঁছলাম, দেখলাম আসন এক্কেবারে ঠাসাঠাসি করে পূর্ণ।আমার জায়গা হল দরজার বাইরে, অনেকটা আগেকার দিনের মহিলাদের চিকের আড়াল থেকে অনুষ্ঠান দেখার মত।
সঞ্চালনা করছিলেন মানস সরকার, গল্প পাঠে উপস্থিত ছিলেন, অমিতাভ দাস, আয়োজক প্রগতি মাইতি, ভজন দত্ত, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, রুমকি রায় দত্ত, ইন্দ্রনীল বক্সী, অরূপ আচার্য, মানস সরকার, দেবশ্রী ভট্টাচার্য  এবং যাঁর উদ্যোগে গল্প বৈঠকের প্রথম সূচনা, সেই ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। আলোচনায় ছিলেন শ্যামল ভট্টাচার্য, বুবুন চট্টোপাধ্যায় এবং তৃষ্ণা বসাক।
প্রথম গল্প পাঠ হাবড়ার অমিতাভ দাসের। এক নব দম্পতির অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে বারবার ফোন আসে মেয়েটির মায়ের। স্বাভাবিক ভাবেই অসন্তুষ্ট হয় স্বামী। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সবাই সবাইকে ভালোবাসে , কারো দাবীই অন্যায্য নয় তবু অজান্তেই নিজের প্রিয়জনকে আঘাত দিয়ে ফেলে মানুষ। এই আসরে গল্পের শব্দ সংখ্যা বেঁধে দেওয়া হুয়েছিল ৮০০ শব্দে। কিন্তু লেখকের এই গল্পটির মনে হয় আরো কিছু শব্দের প্রয়োজন ছিল। তাই শেষটা মনে হল হঠাৎ করেই এসে গেল। একটা সুন্দর গল্প যেন দানা বাঁধতে বাঁধতেও বাঁধল না।
এর পরেই ছিল দেবশ্রীর গল্প পাঠ। আমার গল্পটি ছিল এক পথ শিশুকে নিয়ে। এক স্কুলের সামনে একটি ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। মেয়েটির মা সেখানে কাজ করে আর মেয়েটি নীচে মাটিতে খেলা করে। যাকে দেখে তার কাছেই ছুটে গিয়ে সে বলে 'তুইঙ্কল তুইঙ্কল লিতিল এস্তার' ।সবাই বিরক্ত, আসলে মেয়েটি বোঝাতে পারে না, সে পাগল নয়, ভিক্ষাও করতে চায় না। সে শুধু জানতে চায় এর পরের লাইনটা কী!
প্রগতি মাইতির গল্পের নাম কান। গল্পের নায়ক দু একবার তার পরিবারের লোকজনদের কথায় বিরক্ত হয়ে কথা না শোনার ভান করেন, তাতেই তাঁর পরিবারের লোকজনের ধারণা হয় তিনি কানে কম শুনছেন। তাঁকে ডাক্তার দেখানোর কথা চলে।
বাঁকুড়া থেকে আসা ভজন দত্তর গল্প শুনে সত্যি অবাক হলাম । ওনার গল্পের শুরুটা অসাধারণ লাগল, লেখিকার লিখতে লিখতে হঠাৎই মনে পড়ল তিনি গ্যাসে ভাত চাপিয়ে এসেছেন। গিয়ে দেখলেন যথারীতি ভাত পুড়ে গেছে। এরকম ঘটনার সঙ্গে  আমরা প্রায়ই সম্মুখীন হই, অবশ্য এতে লেখক কূলের অনেক আপত্তি শোনা গেল, তাঁদেরও লেখার সময় প্রায়ই ছটা ডিম এনে দেওয়ার হুকুম শুনতে হয়। যাই হোক ফিরে আসি লেখকের গল্পে। যে ঘটনা দিয়ে তাঁর গল্প শুরু হয়েছিল , শেষ হল কিন্তু একটু অন্যভাবে। লেখিকা যেন তাঁর কল্পনার চরিত্রকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন। বেশ অন্যরকম লাগল গল্পটি।

অগ্রজ লেখিকা সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পটি অত্যন্ত চেনা জানা। কিন্তু উপস্থাপনা সত্যিই অসাধারণ। দুই পুরনো বন্ধুর দেখা হয়ছে। দুজনেই বেশ বৃদ্ধ। এক বন্ধু চোখে কম দেখেন, আরেক জন কানে প্রায় কিছুই শোনেন না। যে বন্ধু চোখে দেখেন না, তিনি বন্ধুকে না চিনেও অনায়াসে আরেক বন্ধু ভেবে কথা বলে যান। আরেক জন কানে না শুনেও তার উত্তর দিয়ে যান। দুজনেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত সৈনিক। নিজেদের জীবন উজাড়  করে দিয়েছেন সন্তানের জন্য, আজ তাঁরা ক্লান্ত , একা ।
দীর্ঘদিনের একান্তর পত্রিকার সম্পাদক অরূপ আচার্য পড়লেন তাঁর গল্প। সেটি কবিতার মত সুন্দর ভাষার বুননে মাত্রা পায়। সমালোচকের ভাষায় একটু কাব্যিক ব্যাঞ্জনার ভাগ যেন বেশিই  ছিল।
বর্ধমানের  ইন্দ্রনীল বক্সির 'জড়ুল' গল্পটি বেশ ভালো লাগল, গল্পের নায়ক তার স্ত্রীকে ভালোবাসতো, কিন্তু সে বহুদিন অসুস্থ।এমন রুগ্ন স্ত্রীকে আর কোন পুরুষের ভালো লাগে। নায়কের মাঝে মাঝে খুন করে এই ধুকপুক করতে থাকা জীবন কে শেষ করে দিতে ইচ্ছে হয়। সে আকৃষ্ট হতে থাকে আয়ার কাজ করতে আসা মেয়েটির দিকে।স্ত্রীর পিঠে থাকা জড়ুল ,যা একসময় তাকে আপ্লুত করে রাখত, তা ছেড়ে সে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হতে থাকে আয়ার কাজে আসা মেয়েটির উল্কির দিকে। গল্পটির চমক একেবারে শেষে, যখন প্রায় মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রী তার স্বামীর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলে 'আমি জানি'।
হুগলীর রুমকি রায় দত্তর গল্প অভিসারিকা এক না পাওয়া প্রেমের কাহিনী। জন্ম থেকে মুক ও বধির মেয়েটির জীবনেও প্রেম এসেছিল, কিন্তু সে প্রেম স্থায়ী হতে পারেনি। তবু মেয়েটি বিরহিনী রাধার মত , সেজে গুজে এসে দাঁড়ায় শেষ ট্রেনটি যাওয়ার সময় । তার প্রতীক্ষা যদি সেই প্রেম কখনো ফিরে আসে।
চন্দননগরের মানস সরকারের গল্পটি একটু অভিনব। ভূত, ফ্যান্টাসি সব মিলিয়ে এক অন্য রূপ নিয়েছে। বাবা মা সন্তানের জন্য চিন্তা করেন, খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । মাঝে মাঝে এটা একটা বিরক্তির পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অথচ অবচেতনে চাই বাবা মা আমাদের কথা চিন্তা করুক। এই গল্প শুনতে শুনতে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে গেল। তখন পার্ট ওয়ান পরীক্ষা দিচ্ছি। যথেষ্ট বড় হয়েছি বাবা ,মা দিতে যায় না। কলেজে বাবা মাকে নিয়ে যাওয়া বড্ড লজ্জার ব্যাপার। অথচ কেজানে কেন পরীক্ষা দেওয়ার সময় ভীষণ শরীর খারাপ লাগল, মাথা ঘুরছে শরীর অবশ হয়ে আসছে। কোনমতে পরীক্ষা শেষ করে ভাবছি এই অবস্থায় বাড়ি ফিরব কী করে ! ইস্ ! এই সময়ে যদি বাবা থাকত, হল থেকে বেরিয়েই দেখি সামনে বাবা। জীবনে এত অবাক কোনদিন হইনি। বলল , এখানে কাজে এসেছিলাম ভাবলাম তোকে নিয়ে ফিরি। গল্পটার সাথে সেদিনের সেই ঘটনার মিল পাই।
শেষ গল্প ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের" প্লামকেক এবং" । ভূতের গল্প। এই গল্পটিও বাবা মা ও মেয়ের। তবে গল্পটি এই জগৎ ছেড়ে অন্য জগতে পাড়ি  দিয়েছে অন্য এক জগতে। যে স্নেহ ইহ জগতে পূর্ণতা পায়নি , সেই স্নেহই যেন সদ্য করা প্লামকেকের গন্ধ মেখে মৃত্যুর পরেও ফিরে ফিরে আসে।


প্রতিটি গল্পের খুব সুন্দর বিশ্লেষনাত্মক আলোচনা করলেন বুবুন চট্ট্যোপাধ্যায়, শ্যামল ভট্টাচার্য এবং তৃষ্ণা বসাক। 

প্রগতি বাবুর আতিথেয়তা অতুলনীয়। গল্পের মাঝখানেই এল চা ও সিঙ্গারা। প্রত্যেকের হাতে প্রগতি বাবু সামান্য উপহার তুলে দিলেন। দূর দূর থেকে আসা গল্পকার দের মন তখন কানায় কানায়। 
আমার গল্পটি ফুরলো তবে নটে গাছটি মুড়লো না। আড্ডা শেষ হল আরো একটা আড্ডার পরিকল্পনার মাধ্যমে। তবে সেটা এখন গোপন থাক, সে গল্প পরে হবে।

২টি মন্তব্য: