বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২০

গড়বেতায় গল্পবৈঠক ৪০

   

সাহিত্যিক অভিজিত্ চৌধুরীর উত্সাহে এবং আয়োজনে পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা ৩ ব্লকের চন্দ্রকোণারোডের পরিমল কাননে  অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গল্পবৈঠকের চল্লিশতম অনুষ্ঠান।সেদিন ছিল আন্তর্জাতিক নারীদিবস কিন্তু গল্পপাঠে সংখ্যাগুরু ছিলেন জেলার পুরুষ গল্পকারেরা।প্রত্যেকে নিজের সেরা গল্পটি পরিমল কানন সভাগৃহে পাঠ করলেন । প্রত্যেকটি গল্পের সুচারু আলোচনা করলেন সহ লেখকরা নিজেদের মধ্যেই। সব গল্পকার এবং উপস্থিত সকল শ্রোতাদের জন্য সুন্দর মধ্যাহ্নভোজনের ব্যাবস্থাও ছিল সেদিন।  লীনা চৌধুরীর গান দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হল। প্রথম গল্প "চারুবালা" , পড়লেন জয়ন্তী মণ্ডল ।  খুব চেনা ঘটনা অবলম্বনে বর্তমানে বৃদ্ধদের করুণ জীবনের কাহিনী যখন গল্প হয়ে ওঠে তখন মনে হয় শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর হতে পারে। আত্মীয় পরিজনেরা ত্যাগ করে তাদের। তবে এই গল্প সেই আত্মীয় পরিজনদের কথাটুকু সামান্যতম উল্লেখ দাবী করে।  শুধুমাত্র বৃদ্ধার প্রতি সহানুভূতির উদ্রেক হয় পাঠক-শ্রোতার। বিপরীতে আত্মীয় পরিজনেরা কেন কাঠগড়ায় সেটাও জানতে ইচ্ছে হল। তবে গল্পের ঠাস বুনুনি আগাগোড়া ভালো লাগে। এরপর কাশীনাথ সাহার গল্প "টান"। মূলতঃ রম্য লেখক এত সিরিয়াস একটি গল্প শোনালেন যে শুনতে শুনতে মন চলে গেছিল প্রান্তিক জনজীবনের মানুষজনের দিকে। অতি সাধারণ বিষয়, অতি চর্চিত প্রেম, মেয়েদের শরীরের দিকে পুরুষের নজর,  আঞ্চলিক ভাষার বয়ানে অনবদ্য হয়ে ওঠে। গ্রাম্য মেয়ের অনুভূতির কথা কিম্বা তার স্বামীর হাবভাব, বিশেষতঃ মদনা চরিত্রটি অত্যন্ত মুনসিয়ানার সঙ্গে এঁকেছেন লেখক। তাঁর কলমকে কুর্ণিশ জানাই।
এরপর রবিঠাকুরের গান গাইলেন নির্মাল্য বিশ্বাস। অপূর্ব তাঁর গায়কী, বলাই বাহুল্য।
তিন নম্বর গল্পটি পড়লেন রাজীব কুমার ঘোষ। গল্পের নাম "প্রতিবিম্বের দিনগুলি" 
গল্পটি ইশকুল লেভেল পদার্থবিদ্যার সাধারণ জ্ঞান দিয়ে শুরু । আয়নার সম্মুখে প্রতিবিম্বের প্রকৃতি দিয়ে। সেটির উল্লেখ প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয়না। তবে তারপরেই শুরু হয় মূল গল্প। মনে করিয়ে দেয় জয়ন্ত নার্লিকারের গণেশের শুঁড় বাঁদিক থেকে ডান দিকে সরে যাবার বিখ্যাত গল্পের কথা। রাজীবের গল্পের বৈশিষ্ট্য তাঁর গল্প বলার সাদামাটা ভাষা। নির্মাণ অত্যন্ত ভালো। সেই গুণে অন্যমাত্রা পেল গল্পটি। আয়নায় আমাদের ডানহাত ভার্চ্যুয়ালি বাঁহাত। এই বিষয় দিয়ে এমন সুন্দর গল্প লিখলেন বলে সাধুবাদ জানাই তাঁকে।   
এরপরের গল্পকার সুমন মহান্তি। লব্ধপ্রতিষ্ঠ ইতিমধ্যেই তিনি। গল্পের নাম "গ্লানিগরল" 
অভিজিত চৌধুরী মাত করলেন তাঁর শেষ নিবেদন  "প্রেমতলা" গল্প টি পাঠ করে । সেদিন গল্পবৈঠকের পক্ষ থেকে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়  একমাত্র হাজির ছিলেন কলকাতা থেকে।  তাঁর গল্পের নাম ছিল "চুনীর আংটি ও থুরা"। 
সেদিন সঞ্চালনার দায়িত্ত্বে ছিলেন বাচিক শিল্পী অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানের শেষে মৌসুমী ঘোষ পড়লেন তাঁর অণুগল্প এবং সেদিনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন মেদিনীপুরের কবি গুরুপদ মুখোপাধ্যায়, বৈঠকের গল্পগুলি নিয়ে সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে। গল্প পাঠের ফাঁকে ফাঁকে নারীদিবসের কবিতা পড়লেন নবীন কবিরা।
সবশেষে মেদিনীপুরের অন্যতম কবি গুরুপদ মুখোপাধ্যায় গল্প নিয়ে আলচনা করলেন। তাঁর মতে প্রতিটি গল্প সূক্ষ্ম সুতোয় গাঁথা। বর্তমানে গল্পের একটি নতুন ঘরানা তৈরী হয়েছে।রাজীব ঘোষের গল্পের কাঠামো নির্মাণ অত্যন্ত ভাল। গল্পের শেষে যে অদ্ভূত ঘাই দিয়েছেন বড়ো সিম্বলিক।গল্পটি  ট্রেইল ধর্মী। অনেকটাই ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছেন তিনি।
সুমন মহান্তির গল্পটিতে কোনো ভণিতা নেই। যা বলতে চেয়েছেন ডায়রেক্ট বলেছেন তিনি তাই এত সুন্দর এই গল্পের সূক্ষ্ম মনোস্তত্ত্ব। চরিত্রগুলি আছন্ন করে রাখে কিছুক্ষণ।
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের গল্পটি একদিকে অলৌকিক অন্যদিকে ম্যাজিক রিয়েলিজম নির্ভর। লাতিন আমেরিকার মার্কেজের কথা মনে করিয়ে দেয়। ম্যাজিক রিয়েলিটি খুব সুন্দরভাবে তুলে আনলেন তিনি।
অভিজিত চৌধুরীর "প্রেমতলা" গল্পটি মনে করিয়ে দেয় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবি উপন্যাসের কথা। বৈষ্ণব আখড়া, কীর্তণের পদের ব্যাবহার আরো ভালো লাগে শুনতে। লেখকের নারী চরিত্র সুহাসিনী একটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ চরিত্র। আমাদের মনের মধ্যে কামনার যে দ্বন্দ্ব বারেবারে আমাদের তাড়িত করে চলে,আমাদের মধ্যে আমি ও তুমির প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব আমাদের রক্তাক্ত করে চলে সুহাসিনী সেখানে পরাজিত হয়। কবি চরিত্রের বসনের মত সেও বলে ওঠে যেন "বলতে পারো কবিয়াল, জীবন এত ছোট ক্যানে?" 

আনন্দবাজার পত্রিকা, পশ্চিম মেদিনীপুর বিভাগে ৯ই মার্চ ২০২০ 

মঙ্গলবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

৩৯ তম গল্পবৈঠকের শীত পিকনিক





ছর চারেকের মধ্যে মাত্র ৩৮টি অধিবেশনেই গল্পবৈঠক গল্পচর্চার কেন্দ্র হিসাবে ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে। নগর কলকাতার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ না নিজেকে রেখে ছড়িয়ে দিয়েছে আশেপাশের জেলায়। বিস্তৃত হয়েছে তার ম্যাপ। 'গল্পবৈঠক' এর হাতে হাত রেখেই উঠে এসেছেন জেলার নবীন এবং প্রবীণ গল্পকাররা। পেয়েছেন গুরুত্বও। ব্যতিক্রমের সেই দৃষ্টান্ত বজায় থাকল ৩৯ নং বৈঠকেও। পিকনিকের আমেজে, মিঠেল শীতের হাওয়া, শীতফুলের পসরা আর রোদ মেখে চমৎকার অধিবেশন পালন হল এবার। গল্পবৈঠকের অন্যতম মুখ ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটের ছাদে, ঘরোয়া পরিবেশে। দিনভর অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে সম্মানিত করা হল 'একান্তর' পত্রিকার সম্পাদক, লেখক অরূপ আচার্যকে, যিনি ও ওঁর পত্রিকা সাহিত্যের আঙিনায় এক ব্যতিক্রমের উদাহরণ। বছরের পর বছর ধরে অন্য ধরনের লেখার পাশাপাশি এ পত্রিকার পাতা থেকেই উঠে এসেছেন সাম্প্রতিক সময়ের বহু নারী লেখক। পত্রিকা ও সম্পাদক সম্পর্কে নিজেদের অনুভব ও স্মৃতিকথার ডালি মেলে ধরলেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, তৃষ্ণা বসাক, বুবুন চট্টোপাধ্যায়, কঙ্কাবতী দত্ত, মধুশ্রী সেন সান্যাল, বিতস্তা ঘোষাল, প্রমুখ। শাল, উপহার, ও সম্মাননা পত্র অরুপ আচার্যের হাতে গল্পবৈঠকের পক্ষ থেকে তুলে দেওয়া হয়। এরপর হল একান্তর উৎসব সংখ্যা প্রকাশ।




দ্বিতীয় পর্বে ছিল অনধিক ২০০ শব্দে অণুগল্প পাঠ । বিষয় ছিল "এক কাপ চায়ে"। চা পান ও তার বিচিত্র মুহূর্ত উঠে এল চন্দ্রানী বসু, সুপ্তশ্রী সোম, ব্রততী সেন, সুস্মেলী দত্ত, মৌসুমী ঘোষ, সঙ্গীতা দাশগুপ্ত রায়, মানসী গঙ্গোপাধ্যায়, তপশ্রী পাল, কাকলী দেবনাথ, নন্দিনী সেনগুপ্ত, নিবেদিতা ঘোষ মার্জিত, শ্যামলী আচার্য, কেকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুজাতা রায়, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, শুভশ্রী সাহা ও ভজন দত্তের পাঠে। মধুর সঙ্গীত পরিবেশন করলেন অগ্রজ লেখিকা শ্রীমতী কণা বসু মিশ্র। চমৎকার একক অভিনয় করে দেখালেন নাট্য ব্যাক্তিত্ত্ব শ্রী অরূপ আচার্য। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন  মানস সরকার। চমৎকার দ্বিপ্রাহরিক ভোজন আর চলল দেদার আড্ডাও। দূষণভরা শহরে নেমে এল তাজা এক ঝলক হিমেল বাতাস। মহানগরের গল্পকারদের সঙ্গে চুঁচুড়া থেকে চন্দননগর, কল্যাণী থেকে ঝাড়খণ্ড, বাঁকুড়া থেকে কাঁচড়াপাড়া সব লেখকের গল্পে গল্পে একাকার হয়ে গেল সেদিন।

প্রতিবেদনেঃ মানস সরকার 

মঙ্গলবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

বইমেলা ২০২০ তে গল্প বৈঠক ৩৮

   
  
ন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা ২০২০ তে এবারে অনুষ্ঠিত হল গল্প বৈঠকের ৩৮ তম অণুগল্প পাঠের আসর। আয়োজক জনস্বার্থবার্তা পত্রিকা এবং প্রকাশনার পক্ষ থেকে লেখক, সাংবাদিক শ্রী চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য। সবাইকে স্বাগত জানিয়ে গল্পকারদের আসন, শব্দের জন্য মাইক্রোফোন ইত্যাদির সুব্যবস্থা করে দিলেন। উপস্থিত ছিলেন মউল পত্রিকার সম্পাদক শ্রী প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় ।      
নির্দিষ্ট সময়ে গল্পবৈঠকের কর্ণধার দুই গল্পকার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং তৃষ্ণা বসাক ছোট্ট গৌরচন্দ্রিকা দিয়ে সূচনা করার পর প্রথম গল্প পাঠ করলেন শ্রীমতী ব্রততী সেন দাস। শীতলক্ষ্যা নদী,  গল্পটি দেশ ভাগ এবং বার্ধক্যের অবহেলার বিষন্নতাকে ছুঁয়ে বইল। 
পরের গল্পে সোনালি, নকশাল আন্দোলনের সময়কার তরুণতরুণীদের ভেঙে যাওয়া প্রেম,  জীবন আর আদর্শদের ধরতে চেষ্টা করলেন।গল্পের নাম লাল নীল মাছের বাক্স । 
সমাজের স্থির চিত্র ফুটিয়ে তুললেন, তারপরেই শ্রমণা পত্রিকার সম্পাদক চন্দ্রাণী বসু, তাঁর খোঁজ, গল্পে। এরপর  মৌমিতা ঘোষ, শ্বাশুড়ি এবং বৌমার মাঝে বয়ে যাওয়া লুকোনো হিংস্রতা আর পরের প্রজন্মের ওপর তার প্রভাবকে নিপুণ হাতে লিখেছেন শিক্ষা নামে তাঁর গল্পটিতে । নবীন গল্পকার কাকলি দেবনাথ মেয়েদের পাওয়া না পাওয়ার গল্পে ডিমেনশিয়ার পলির ফাঁকে রাখলেন মনস্তত্ত্ব আর সংসারের ওঠানামা। 
এর মধ্যেই আয়োজকেরা নিয়ে এলেন সুগায়ক শ্রী দাশরথি মন্ডলকে। তিনি ছাপাখানার কর্মী হলেও সুগায়ক। তাঁর একটি গানের সিডি প্রকাশিত হল গল্পকারদের হাতে দিয়ে। বই নিয়ে স্বরচিত একটি মন ভাল করা গানও উদাত্তকণ্ঠে শোনালেন শিল্পী।
চায়ের বিরতির পর হঠাত আগত গল্পকার শ্রী সুব্রত বসু সকলের অনুরোধে পাঠ করলেন একটি স্বরচিত অনুগল্প। তাঁর গল্পের নাম ছিল স্বাধীনতার হীনতায়।  
এরপর অগ্রজা লেখিকা শ্রীমতী সর্বানী বন্দ্যোপাধ্যায়, এরপরে, তাঁর, ফ্রি, গল্পে আজকের ভোগবাদী জীবনের ছবি ফুটিয়ে তুললেন অনায়াসে। সমাজের আরেক নিপুণ চিত্র পরিবেশিত হল, লেখক অমিতাভ দাসের গল্প, টাটকা য়। 
সমসাময়িক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ওপর একটি প্রাসঙ্গিক গল্প শোনালেন শ্রীমতী শ্যামলী আচার্য। গল্পের নাম, কাগজ আর শুভশ্রী সাহার গল্প অস্তিত্ব ও ছিল চমৎকার।  
বিকেলের আলোয় শেষ দুটি গল্প ছিল তপশ্রী পালের  জলছবি এবং ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের  ঘুমপাড়ানি চাউমিন। 
সমাজ, সংসার এবং তার মাঝে মেয়েদের অবস্থান, গল্পের লেখায় ফুটে উঠে সকলের মন ছুঁয়ে গেল। 
বই মেলার এই রোমাঞ্চকর প্রেক্ষাপটে নিজস্ব শব্দদের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে পৌঁছে দিতে পারার আনন্দ মনের মনিকোঠায় সঞ্চয় করে রাখল গল্প বৈঠকের সদস্যরা। সেদিন তৃষ্ণা বসাকের কবিতা পাঠ দিয়ে শেষ হল বইমেলায় গল্প বৈঠকের ৩৮ তম সাহিত্য বাসর। 




লিখেছেন - সোনালি 

মঙ্গলবার, ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২০

গল্প বৈঠক ৩৭ @ পান্ডুয়া


কোনও কোনও দিন হঠাৎ করেই বিশেষ হয়ে ওঠে। এমনই এক বিশেষ দিন ছিল গত ২৫শে জানুয়ারি। 'গল্পবৈঠক 'ও  পান্ডুয়ার ' গ্রাহম বেল সেন্টার ফর ডেফ' এর উদ্যোগে মিলিত হল সাহিত্যের সাথে সমাজ ও জীবনযুদ্ধের গল্প । এই গল্পে নেই কোনও পরাজিত মানুষের কাহিনি। গল্পবৈঠকের ৩৭তম আসরে দশজন গল্পকার অরিন্দম গোস্বামী, কাকলী দেবনাথ, সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, ইন্দিরা মুখোপধ্যায়, মৌসুমী ঘোষ, ইন্দ্রনীল বক্সী, রাজেশ কুমার এবং রুমকি রায় দত্ত ছাড়াও হাজির ছিলেন দুই খুদে গল্পকার  অনন্বয় গোস্বামী এবং শ্রীপর্ণা  ঘোষ । সবাই স্বরচিত কিশোর গল্প পাঠ করে শোনালেন মূক ও বধির ছাত্রদের । প্রায় অসম্ভব এই অভিনব প্রয়াসকে সম্ভব করে তুললেন, সংস্থার সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিক্ষক শান্তনু পাত্র। তিনি গ্রাহম বেল সেন্টারের একজন সক্রিয় কর্মী। এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে প্রতিবন্ধী, মূক ও বধির শিশুদের সমাজের মূলস্রোতে রেখে স্বনির্ভর করে তোলার কাজে নিয়োজিত।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় ছোট্ট শিল্পী অনুরাগ রায়ের সুচারু সঙ্গীত পরিবেশনা দিয়ে। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন রুমকি রায় দত্ত।
অনুষ্ঠানের অন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল 'নির্বাক' গ্রুপের মূকাভিনয়। শিল্পীরা প্রত্যেকেই মূক ও বধির । সুরজিৎ অধিকারী, প্রসেনজিৎ হাজরা, বিপুল বৈরাগী, সুরজিৎ সরেন, এই চারজন শিল্পীদের সাবলীল অভিনয় মুগ্ধ করে উপস্থিত সকলকে। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয় বধির ছাত্রদের সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনে। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে উত্তম মধ্যাহ্ন ভোজনের ব্যাবস্থাও ছিল সাহিত্যিকদের জন্য।



সঞ্চালক, গল্পকার রুমকি রায় দত্ত 

প্রতিবেদনেঃ রুমকি রায় দত্ত 

শুক্রবার, ৩ জানুয়ারী, ২০২০

শীতকালীন পিকনিকে গল্পবৈঠক ৩৬

গল্পমেলা, সারাবেলা 


গত ২১শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দক্ষিণ কলকাতার রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন লেকফ্রেন্ডস ক্লাবের লনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক অভিনব গল্পপাঠের আসর। আয়োজক ছিল দাঁড়াবার জায়গা প্রকাশনা সংস্থা। বাংলাসাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হয়ে এমন গল্পমেলা খাস কলকাতার বুকে বুঝি বড় একটা হতে দেখা যায়না। শীতের সোনাগলা রোদ্দুরে বনভোজনের ফাঁকে লেখকরা তাঁদের উত্কৃষ্ট স্বরচিত গল্প পাঠ করলেন সেদিন।
রাজ্য জুড়ে যেসব গল্প সংগঠনগুলি নিয়মিত গল্পচর্চার মধ্যে থাকেন তাঁরা ছিলেন এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। এদের মধ্যে হাজির ছিল গল্পবৈঠকের এক ঝাঁক গল্পকারেরা। অবগুন্ঠন সাহিত্য পত্রের অনুগল্পকারেরা। চূঁচুড়া গল্পসল্পের আটচালার বেশ কয়েকজন গল্পকার । এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কাঁচড়াপাড়ার শ্রমণা পত্রিকার তরফ থেকে চন্দ্রাণী বসু এবং সাইন্যাপস পত্রিকার মৌসুমী ঘোষ।  এদিন গল্পের অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রচেত গুপ্ত, ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং চুমকি চট্টোপাধ্যায়। শ্রোতা অতিথি ছিলেন সানন্দা, উনিশ কুড়ি পত্রিকার সম্পাদক পায়েল সেনগুপ্ত। সুদীপ চক্রবর্তীর প্রাককথন দিয়ে শুরু হল সেদিনের গল্পবেলা। এরপরেই অন্যতম সঙ্গীতশিল্পী পরমা দাশগুপ্তর রবীন্দ্রসংগীত দিয়ে সূচনালগ্ন আরো মধুর হয়ে উঠল। সকালবেলার গল্প সঞ্চালক ছিলেন সৌভিক গুহসরকার। প্রধান অতিথিদের বরণ করার পরে শুরু হল গল্পপাঠ। গল্পবৈঠকের ন'জন তাদের গল্পপাঠ করলেন একে একে। এদের মধ্যে ছিলেন সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃষ্ণা বসাক, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, সংযুক্তা সেনগুপ্ত, রুমকি রায় দত্ত, ইন্দ্রনীল বকসি, নন্দিনী সেনগুপ্ত, তপশ্রী পাল এবং সুপ্তশ্রী সোম। গল্পসল্পের আটচালার বিমল গঙ্গোপাধ্যায়, অরিন্দম গোস্বামী, সুব্রত বসু, সিক্তা গোস্বামী এবং কাকলি দেবনাথ খুব সুন্দর গল্প পড়লেন।
মৌসুমি ঘোষের "আয়না" এবং  চন্দ্রাণী বসুর  "ক্লোরোগ্লোবিন" নামের দুটি গল্পও ছিল অসাধারণ । অমিতাভ দাস অণুগল্প নিয়ে অনেক কাজ করে চলেছেন। তাঁর অবগুন্ঠন সাহিত্যপত্রের তিনি ছাড়াও ঐদিন যুগান্তর মিত্র, প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথ, মানসী গাঙ্গুলী, গল্প পড়লেন। সেদিনের অন্যতম প্রাপ্তি ছিল  গল্পকার প্রচেত গুপ্ত, ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায় এবং চুমকি চট্টোপাধ্যায়ের কন্ঠে তাঁদের স্বরচিত গল্পপাঠ শোনা। অপূর্ব এক গল্পের আবহ তৈরী করে দিলেন তাঁরা। সঙ্গে চলতে লাগল ধূমায়িত কফি সহযোগে বিস্কিট পর্ব। বেলা বাড়তেই শ্রোতা এবং গল্পের কুশীলবদের সামনে পরিবেশিত হল সুখাদ্য। গরমাগরম খিচুড়ির সঙ্গে বেগুণী, ডিমের কষা, আলুর দম এবং গুড়ের রসোগোল্লা ছিল সেদিনের মেন্যু। গল্পসভার অধ্যক্ষ শ্যামলী আচার্য সেই ফাঁকে আমন্ত্রণ জানালেন সঙ্গীত শিল্পী শ্রাবণী রায় কে । গল্পের খেয়া বয়ে চলল নিজের মত করে, শীতের দুপুরে। গল্পপাঠের দ্বিতীয় অধিবেশনে বিকেলবেলার সঞ্চালক ছিলেন উপাসনা সরকার। দাঁড়াবার জায়গা প্রকাশনার তরফ থেকে প্রত্যেক গল্পকারকে বরণ করে নেওয়া হল সুদৃশ্য বাহারী ফুলগাছ দিয়ে। সাহিত্যের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক নারায়ণ শূর, দেবকুমার চক্রবর্তী, পিনাকী চক্রবর্তী এবং সর্বোপরি কবি তন্ময় চক্রবর্তীর সহযোগিতা ছাড়া এমন গল্পের অনুষ্ঠান সম্ভবপর হতনা।
সেদিন উপস্থিত গল্পকারদের মধ্যে সর্বাণী বন্দ্যোপাধ্যায়ের "জননী", তৃষ্ণা বসাকের উকুন সিরিজের গল্প,  ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের "সঙ্গীত নন্দন", ইন্দ্রনীল বক্সীর "উইকেট কিপার", রুমকি রায় দত্ত'র "বেওয়ারিশ, সুপ্তশ্রী সোমের "শো-উইন্ডোর লালপরী, নীলপরী", তপশ্রী পালের "সান্টা", নন্দিনী সেনগুপ্ত'র "মা" অত্যন্ত প্রশংসিত হয়।  এছাড়া সুব্রত বসুর "জিপার", অমিতাভ দাসের "সবুজ রঙের পদ্ম" , অরিন্দম গোস্বামীর "কখনও হঠাত”,  বিমল গঙ্গোপাধ্যায়ের "আজ নয়" সিক্তা গোস্বামীর "মাতৃরূপেণ", প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথের "আলোর দিকে" , মানসী গাঙ্গুলির "অন্য কুমোরটুলি”, যুগান্তর মিত্র'র "বেওয়ারিশ" ও ছিল এক সে বড় কর এক সব গল্প । ভালো একটা গল্পের দিনে এমনি প্রাপ্তি হল শ্রোতাদের। 
এভাবেই সাহিত্যের মুক্তাঙ্গনে বাংলা ছোটগল্পের জয়জয়াকার হোক। সাহিত্য নামের মহীরুহের অনেক শাখা প্রশাখা। প্রবন্ধ, উপন্যাস, কবিতা, ছড়া, ভ্রমণা কাহিনী, রম্যরচনা, অনুবাদ সাহিত্য এসবের মধ্যে সেই বৃক্ষের সবচেয়ে শক্তপোক্ত শাখাটি হল ছোটগল্প। সার্থক ছোটগল্প লেখা সবচেয়ে বুঝি কঠিন কাজ। সেটির উত্তরণ এমন অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আরও আরও বিকশিত হোক। চারিদিকে এত এত অন্যান্য শীত মেলার রমরমিয়ে আয়োজনের পাশাপাশি নবীন এবং প্রবীণ গল্পকারদের মেল বন্ধনে গ্ল্পমেলাও চলতে থাক। ছড়িয়ে পড়ুক জেলায় জেলায়। এগিয়ে আসুন সম্পাদক, প্রকাশকেরা। তবেই না বাংলা সাহিত্যের প্রতি দু-তরফের সামান্যতম ঋণ শোধ হবে? গল্পকারদের স্থান দিন। বিজয়ী হোন তাঁরা ।
রবিঠাকুরের কথায় বলতে ইচ্ছে করল,

“ তব মন্দির অঙ্গন ভরি মিলিল সকল যাত্রী। স্থান দাও, স্থান দাও, দাও দাও দাও হে। "